| ছবি: ইমরান হোসাইন
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার উপকূলজুড়ে নির্মিত বেড়িবাঁধের বেশিরভাগ অংশ এখনো জোয়ারের ঢেউ ঠেকিয়ে মানুষকে সুরক্ষা দিলেও রায়পুর ইউনিয়নের মধ্যম গহিরা বাইঘ্যার ঘাট এলাকায় প্রায় ১২০ মিটার অংশ রয়ে গেছে চরম ঝুঁকিতে। টানা বর্ষণ ও জোয়ারের তোড়ে ক্ষতিগ্রস্ত এই অংশ নিয়ে উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন অর্ধলক্ষাধিক উপকূলবাসী। ভাঙন ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ অংশ দ্রুত স্থায়ীভাবে সংস্কার না হলে বড় জোয়ার কিংবা ঘূর্ণিঝড়েই ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়েই বসবাস করছেন তারা। বেড়িবাঁধের উপরের অংশ কাদামাটি দিয়ে তৈরি হওয়ায় তাদের চলাচলে যেমন কষ্ট হচ্ছে তেমন দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে রোগী স্বজন কিংবা স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের। জানা যায়, মূলত এই বেড়িবাঁধের ওপর দিয়ে শুধু স্থানীয়রাই নন, নিয়মিত যাতায়াত করেন মাছবাহী ট্রাকসহ বিভিন্ন ভারী যানবাহন। পাশাপাশি প্রতিদিন স্কুলগামী শিক্ষার্থীরাও এই পথ ব্যবহার করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করে। তবে বেড়িবাঁধের ওপরের অংশটি কাদামাটিতে তৈরি হওয়ায় এবং তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সাধারণ মানুষের চলাচলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। একটু বৃষ্টিতেই মাটি নরম হয়ে কাদা জমে যাওয়ায় রোগী বহন কিংবা শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া এখন এক রকম ঝুঁকিপূর্ণ লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এই অংশ দ্রুত স্থায়ীভাবে সংস্কার না হলে যেকোনো বড় জোয়ার বা ঘূর্ণিঝড়ে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের বাইঘ্যার ঘাট এলাকার সেই ঝুঁকিপূর্ণ ১২০ মিটার অংশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্দেশনায় আগে থেকেই জিও টিউব দেওয়া হয়েছে। তবে বাঁধের ভঙ্গুর দশা দেখে এলাকার সাধারণ মানুষের চোখে-মুখে এখনো ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। কাদামাটি ও খানাখন্দে ভরা এই সরু বাঁধের ওপর দিয়েই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে এলাকার স্কুলগামী কোমলমতি শিশুরা। একটু পরপরই মাছবোঝাই ভারী ট্রাক যাতায়াত করায় মাটি কেঁপে উঠছে, যা আতঙ্কে ফেলছে পথচারীদের। কাদা আর স্লিপারি রাস্তার কারণে কোনো রোগী বা প্রসূতিকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন পড়লে অ্যাম্বুলেন্স বা গাড়ি তো দূরের কথা, মূল সড়কে নেওয়াও এখন বড় এক চ্যালেঞ্জ। স্থানীয়দের আশা, অস্থায়ী এসব জিও ব্যাগের পাশাপাশি দ্রুত যেন স্থায়ী কংক্রিট বা টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের মূল কাজটি শুরু হয়, যাতে আসন্ন বর্ষা বা জলোচ্ছ্বাসের আগেই তাদের ঘরবাড়ি ও জীবন পুরোপুরি নিরাপদ হয়। স্থানীয় যুবক আহমদুর রহমান বলেন, ‘বেড়িবাঁধটি এ ইউনিয়নের মানুষের রক্ষাকবচ হিসেবে ভূমিকা রাখছে। এই বর্ষায় বাঁধের প্রায় দুই থেকে তিন ফুট অংশ ভেঙে গেছে। বাকি আছে মাত্র দুই থেকে আড়াই ফুটের মতো, যা কোনোমতে এখানকার মানুষের জীবনভাগ্য টিকিয়ে রেখেছে।’ জেলে সালেহ আহমদ বলেন, ‘বাঁধের কাজ করা না হলে পানির সাথে ঘরবাড়ি মিশে তলিয়ে যাবে। আমরা সবসময় চিন্তিত থাকি বাঁধের সামান্য এই অংশটুকুর কারণে। এখানকার মানুষের জীবন ও শেষ-সম্বল নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।’ ৩ নম্বর রায়পুর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য মো. ছালেহ আহমদ বলেন, কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে বাঁধের মাটি সরে গেছে। সামনে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো বড় আঘাত বেড়িবাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ মোকাবিলা করতে পারবে না। দ্রুত এ বাঁধ সংস্কারের উদ্যোগ না নিলে উপকূলের মানুষ ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালে আনোয়ারা উপকূল রক্ষায় প্রায় ৫৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বেড়িবাঁধ উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। গত জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় পোল্ডার-‘এ’ এলাকায় পারকি সমুদ্র সৈকতের সাপমারা খাল থেকে সরেঙ্গা পর্যন্ত এবং পোল্ডার-‘বি’ এলাকায় শিকলবাহা থেকে ভরাশংখ মোহনা পর্যন্ত প্রায় ৪৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ উন্নয়ন করা হয়। তবে মধ্যম গহিরা বাইঘ্যার ঘাটের ১২০ মিটার এবং ঘাটকূল এলাকার প্রায় ৭০০ মিটার বাঁধ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। জানতে চাইলে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম বিভাগ-১ নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ বলেন, ‘আনোয়ারায় বর্তমানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে ২ দশমিক ৭৭৫ কিলোমিটার এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মাধ্যমে ২ দশমিক ৪ কিলোমিটার উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসনের কাজ চলছে। আমাদের অংশের প্রায় ১ দশমিক ২ কিলোমিটার কাজ শেষ পর্যায়ে। বাইঘ্যার ঘাটের ১২০ মিটার অরক্ষিত অংশও এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত। শুষ্ক মৌসুমে সেখানে স্থায়ী কাজ করা হবে। এর আগে ঝুঁকি এড়াতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব দিয়ে অস্থায়ী সুরক্ষা দেওয়া হবে। আমরা আশা করছি, জুন ২০২৭-এর মধ্যেই প্রকল্পের সব ভৌত কাজ সম্পন্ন হবে।’ পাউবো বলছে, অনুমোদিত প্রকল্পের কাজ শুরু হলে দীর্ঘদিনের ঝুঁকি দূর হবে এবং আনোয়ারার উপকূলীয় জনপদ পাবে আরও টেকসই সুরক্ষা। আর সেই কাজ দ্রুত বাস্তবায়নের অপেক্ষায় উপকূলের হাজারো মানুষ। তবে স্বস্তির খবর হলো, একনেক অনুমোদিত নতুন প্রকল্পের আওতায় আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নে ২.৭৭৫ কিলোমিটার এবং জুইদণ্ডী ইউনিয়নে ২.৪০০ কিলোমিটার টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিতে থাকা বাইঘ্যার ঘাট, ঘাটকূলসহ উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো জোয়ার-জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা পাবে। কাজ শুরু হলে উপকূলবাসীর দীর্ঘদিনের উদ্বেগ অনেকটাই দূর হবে।