প্রকাশ :: ... | ... | ...

আলোকিত পর্যটন নগরীর অন্ধকারে পথশিশুদের জীবনসংগ্রাম


সংযুক্ত ছবি

| ছবি: শাহাদাত হোসেন সাজ্জাদ

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো পর্যটক এখানে ছুটে আসেন সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। ঝলমলে আলোকসজ্জা, আধুনিক হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ আর পর্যটকদের কোলাহলে মুখর থাকে পুরো সৈকত এলাকা। কিন্তু এই চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নির্মম বাস্তবতা। গভীর রাতে সৈকতের নির্জন বালুচরে দেখা যায় একদল পথশিশু মানবেতর জীবনযাপন করছে। গরু ও ভবঘুরে কুকুরের পাশে খোলা আকাশের নিচে ঘুমিয়ে রাত কাটাচ্ছে তারা। এমন দৃশ্য যে কারও হৃদয় নাড়িয়ে দেওয়ার মতো। সম্প্রতি সৈকতের বালুচর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ৭ থেকে ৮ জন পথশিশু দলবেঁধে ঘুমিয়ে আছে। কারও গায়ে ময়লা জামা, কারও শরীরে নেই পর্যাপ্ত কাপড়। মাথার নিচে নেই বালিশ, শরীর ঢাকার জন্য নেই কম্বল কিংবা নিরাপদ কোনো আশ্রয়। সমুদ্রের ঠান্ডা বাতাস আর বালুচরই যেন তাদের একমাত্র সঙ্গী। শিশুদের পাশেই শুয়ে থাকতে দেখা যায় কয়েকটি কুকুর ও গরু। দূর থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই, এরা মানুষ না ভবঘুরে প্রাণীর সঙ্গে বসবাস করা অসহায় কোনো দল। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব শিশুর অধিকাংশই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। কেউ হারিয়ে এসেছে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে, আবার কেউ দারিদ্র্য, পারিবারিক কলহt কিংবা নির্যাতনের শিকার হয়ে ঘর ছেড়েছে। অনেকে এতটাই ছোট যে নিজেদের ঠিকানাও বলতে পারে না। পরিবারহীন এসব শিশু ধীরে ধীরে সৈকত এলাকাকেই নিজেদের স্থায়ী আবাস বানিয়ে নিয়েছে। দিনের বেলায় এসব পথশিশুকে সৈকতের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। কেউ ফুল বিক্রি করে, কেউ পর্যটকদের কাছে সাহায্য চায়, আবার কেউ গাড়ি পরিষ্কার কিংবা ছোটখাটো কাজ করে খাবারের টাকা জোগাড়ের চেষ্টা করে। পর্যটকদের ফেলে যাওয়া খাবার কিংবা দয়াশীল মানুষের দেওয়া খাবারই অনেক সময় তাদের দিনের একমাত্র ভরসা। কিন্তু রাত নামলেই শুরু হয় তাদের সবচেয়ে কঠিন সময়। নিরাপদ আশ্রয় না থাকায় সৈকতের নির্জন বালুচরেই দলবেঁধে শুয়ে পড়ে তারা। স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, মাঝেমধ্যে কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এসব শিশুর জন্য খাবার কিংবা পুরোনো কাপড় নিয়ে আসে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। বেশিরভাগ সময় শিশুদের না খেয়েই রাত কাটাতে হয়। কেউ অসুস্থ হলেও চিকিৎসার সুযোগ পায় না। অনেক সময় তারা বিভিন্ন অপরাধচক্রের খপ্পরেও পড়ে যায়। সচেতন মহল বলছে, পর্যটননির্ভর শহর কক্সবাজারে এমন দৃশ্য অত্যন্ত দুঃখজনক। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রে শিশুদের এমন মানবেতর জীবন সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য লজ্জার বিষয়। শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, এসব পথশিশু প্রতিনিয়ত নানা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। মাদকাসক্তি, ছিনতাই, যৌন নির্যাতন, শিশু পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধের শিকার হওয়ার আশঙ্কা তাদের জীবনে নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পর্যটকদের অনেকেই এ দৃশ্য দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন। কেউ কেউ মোবাইল ফোনে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন। আবার অনেকে শিশুদের হাতে খাবার কিংবা কিছু টাকা তুলে দেন। তবে ক্ষণিকের সহানুভূতি তাদের জীবনের স্থায়ী সমাধান দিতে পারছে না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এসব শিশুর ভবিষ্যৎ অন্ধকারেই থেকে যাবে বলে মনে করছেন সমাজসেবীরা। সমাজকল্যাণকর্মীদের মতে, পথশিশুদের পুনর্বাসনের জন্য সরকার, স্থানীয় প্রশাসন ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, নিয়মিত খাবার, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুদের খুঁজে বের করে পুনরায় পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগও নিতে হবে। শিশুদের মানসিক বিকাশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাউন্সেলিং ও সামাজিক সহায়তাও প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান কিংবা সাময়িক সহায়তা দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। দরকার দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও মানবিক পরিকল্পনা। দারিদ্র্য, পারিবারিক সহিংসতা ও শিশু নির্যাতনের মতো কারণগুলো দূর করতে না পারলে পথশিশুর সংখ্যা আরও বাড়বে। সমুদ্রের ঢেউ যেমন অবিরাম আছড়ে পড়ে সৈকতে, তেমনি প্রতিদিন জীবনসংগ্রামের ঢেউ এসে আঘাত করছে এসব অসহায় শিশুর জীবনে। পর্যটকদের আনন্দ-উল্লাসের শহরে তারা যেন এক অবহেলিত অধ্যায়। উন্নয়নের নানা গল্পের মাঝেও তাদের শৈশব হারিয়ে যাচ্ছে ক্ষুধা, অনিশ্চয়তা আর অবহেলার অন্ধকারে। কক্সবাজারের সৌন্দর্য শুধু সমুদ্র আর পাহাড়ে সীমাবদ্ধ নয়, মানবিকতাতেও তার পরিচয় ফুটে ওঠা উচিত বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা। গরু ও কুকুরের পাশে খোলা আকাশের নিচে ঘুমিয়ে থাকা এসব পথশিশুর জীবন যেন রাষ্ট্র ও সমাজের বিবেককে নাড়া দেয়—এমন প্রত্যাশাই এখন সবার।