কক্সবাজারের চকরিয়ায় বর্তমানে হামের প্রাদুর্ভাবের চেয়ে শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়ার প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ভাইরাসজনিত হামের জটিলতায় অনেক শিশু নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অন্তত দৈনিক অর্ধশত শিশু রোগী ভর্তি হচ্ছে, যার মধ্যে অনেকে শ্বাসকষ্ট ও তীব্র জ্বরে ভুগছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় মেডিকেল টিম কাজ করে যাচ্ছেন। তবে বেশি সমস্যায় পড়েছে নিউমোনিয়া রোগের শিশুরা। চকরিয়ায় গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে তিন মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুরাই এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। প্রতিদিন উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ঠান্ডা জনিত জ্বর ও নিউমোনিয়া রোগে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে তাদের অভিভাবকরা ভিড় জমাচ্ছে চকরিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। আক্রান্ত এসব শিশুকে নিয়ে সরকারী ও প্রাইভেট হাসপাতালসহ বিভিন্ন ডাক্তারের চেম্বারে দৌড়ঝাপ শুরু করছে অভিভাবকরা। সোমবার সকাল ১১টা পর্যন্ত চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সূত্রে জানাগেছে, হাসপাতালে রোববার শিশুসহ রোগী ভর্তি ছিল ১০০ জন, সোমবার রোগী ভর্তি ছিল ৯১ জন। ভর্তিকৃত রোগীর মধ্যে ৭০% শতাংশ ছিল শিশু রোগী। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ঠান্ডা জনিত জ্বর, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশু রোগী ভর্তির সংখ্যা ছিল অন্তত ৫৪ জন। তবে সারা দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা গেলেও বর্তমানে চকরিয়া সরকারি হাসপাতালে হাম রোগের শিশু রোগী রয়েছে ৫জন। বিকেল চারটা পর্যন্ত হাসপাতালের চিত্র অনুযায়ী শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশু রোগী ভর্তির সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৫জন। এর পর থেকে আরো বেশ কয়েক শিশু সরকারী হাসপাতালে ভর্তি এবং চিকিৎসার জন্য যায় বলে জানা যায়। এছাড়াও পৌরশহর চিরিঙ্গার প্রাইভেট হাসপাতালের মধ্যে জমজম হাসপাতাল, ইউনিক হাসপাতাল, মা-শিশু ও জেনারেল হাসপাতালসহ বেশ কয়েকটি হাসপাতালেও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের রোগীর ভিড় পরিলক্ষিত হয়েছে। বৈরি আবহাওয়া, ঋতু পরিবর্তন, দিনে গরম, রাতে ঠান্ডা, জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য সচেতনার অভাবেই এ রোগ বাড়ছে বলে জানালেন শিশু বিশেষজ্ঞরা। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা গেছে, শুধুমাত্র ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে ভিড় করা রোগীদের সামাল দিতে ডাক্তার ও নার্সেরা হিমশিম খাচ্ছেন। আগে থেকে প্রতি শয্যায় একাধিক রোগী ভর্তি হয়ে যাওয়ায় অনেক রোগী হাসপাতালের মেঝেতে অবস্থান করছে। আবার শিশু রোগীকে কোলে নিয়ে মা বেঞ্চের ওপর বসে আছেন। এই অবস্থায় নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অনেক শিশুকে নিয়ে অভিভাবকেরা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভিড় করলেও শয্যা সংকুলান না হওয়ায় ভর্তি করাতে না পেরে বাধ্য হয়ে বেসরকারী হাসপাতালেই ছুটছেন। হাসপাতালটি ৫০শয্যা হলেও প্রতিদিন নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে রোগী আসছে দু’শ থেকে তিন’শ। অনেক সময় সীটের অভাবে রোগীদের চিকিৎসা নিচ্ছে বারান্দার ফ্লোরের ওপর। আবার অনেকে একই সীটের মধ্যে দুই তিনজন গাদাগাদি করে চিকিৎসা সেবা নিতে দেখাগেছে। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা চকরিয়ার পাশ্ববর্তী লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ডুলাহাজারা সংলগ্ন পাগলির আগা এলাকার ছানোয়ারা বেগম নাতি ৩ বছর ৩ মাস বয়সের মো: তায়েফ ঠান্ডা, জ্বর ও নিউমোনিয়া রোগের কারণে আক্রান্ত হলে গত পাঁচদিন আগে হাসপাতালে ভর্তি করান। চিকিৎসা পেয়ে আগের চেয়ে একটু ভাল হয়েছে বলে জানান। চকরিয়ার পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়নের সিকদার পাড়ার সাইফুর ইসলামের ৯ মাস বয়সের পুত্র মো.সাইফান নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয় ৫দিন আগে। প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট ও কাঁশি নিয়ে তিনদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা সেবা করার কারণে এখন আগের চেয়ে কিছুটা উন্নতি হয়ছে বলে মা-বাবা জানান। মীম নামে ২ বছর বয়সের জ্বর ও ঠান্ডা জনিত রোগ নিয়ে এক শিশুকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন বিএমচর ইউনিয়নের কৃষ্ণাপুর এলাকার বাসিন্দা।এবং চকরিয়া পৌরসভার পালাকাটা কালাচান পাড়ার আয়েশা বেগমের ১ বছর ৬ মাস বয়সের রাফিনকে নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসে শয্যা না পাওয়ায় হাসপাতালের মেঝেতে স্থান করে চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে শিশুদের মা জানিয়েছেন। চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা: মোস্তফা কামাল বলেন- প্রতি বছরই এই সময়ে শিশুদের মাঝে শ্বাসকষ্ট জনিত এবং নিউমোনিয়া রোগটা দেখা দেয়। তবে এবার এরই প্রকোপ একটু বেশি। দিনে ভ্যাপসা গরম, রাতে ঠাণ্ডা ও আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে মূলত রোগটা হয়ে থাকে। তবে আমরা আগত শিশুদের রক্ষায় সচেষ্ট আছি। চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শিশু বিশেষজ্ঞ ডা: মোহাম্মদ জায়নুল আবেদীন বলেন- ঋতু পরিবর্তন ও আবহাওয়ার বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কারণে ঠান্ডার পাশাপাশি গরম ও বৃষ্টিপাতের কারণে নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। মূলত এটি ভাইরাস সংক্রামিত রোগ। নির্দিষ্ট সময়ের পর আক্রান্ত রোগী সুস্থ হয়ে ওঠে। তিনি আরো জানান, এখনো পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগী ভালো আছে এবং নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। শয্যা সংকুলান না হওয়ায় আগত রোগীকে হাসপাতালের মেঝেতে স্থান দিয়ে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে। আরো কয়েকদিন পর্যন্ত এই রোগের প্রাদুর্ভাব আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধিও পেতে পারে বলে তিনি জানান।