চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা এলাকায় প্রতিবছরের মতো এবারও বসেছে ঐতিহ্যবাহী নাইতেরো মেলা, যা প্রায় দুই শতাব্দীর ইতিহাস বহন করে চলেছে। বৈশাখ মাসের ২ তারিখে অনুষ্ঠিত এই মেলাটি স্থানীয়দের কাছে শুধু বিনোদনের নয়, বরং সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রাচীনকাল থেকেই এই মেলাকে ঘিরে এলাকার মানুষের মধ্যে দেখা যায় ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে মেলায় অংশ নিতে আসেন। মেলায় থাকে বিভিন্ন ধরনের গ্রামীণ পণ্য, হস্তশিল্প, হাতপাখা,খেলনা, মিষ্টান্ন এবং স্থানীয় খাবারের সমাহার। এছাড়াও মেলার অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে থাকে নাগরদোলা, যা শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সী দর্শনার্থীদের আনন্দ দেয়। কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সজীব কান্তি রুদ্র বলেন, মূলত এটি শিবমেলা হিসেবে পরিচিত হলেও স্থানীয়ভাবে “নাইতেরো মেলা” নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। তিনি আরও বলেন, “নাইতেরো মেলা কর্ণফুলী এলাকার একটি প্রাচীন ঐতিহ্য। এই মেলার মাধ্যমে গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মেলার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং সুন্দরভাবে আয়োজন সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে।” শিকলবাহা ৬ নং ওয়ার্ডের মেম্বার ও কর্ণফুলী উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম বলেন, “কর্ণফুলীর এই ঐতিহ্যবাহী নাইতেরো মেলা শুধু একটি মেলা নয়, বরং এটি গ্রামীণ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল প্রতীক হিসেবে আজও টিকে আছে।” মেলা কমিটির সভাপতি রাজীব শীল জানান, ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে প্রতিবছরই এই মেলার আয়োজন করা হয় এবং আগত দর্শনার্থীদের জন্য নিরাপত্তা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হয়েছে। স্থানীয় গোপাল মাস্টার, শাহা আলম ও প্রদীপ মুন্সীর সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, এই নাইতেরো মেলা বহু আগে সনাতন ধর্মীয় ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে এটি একটি সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। তারা আরও বলেন, মেলাটি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে এবং সারাদিন দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর থাকে। কোনো ধরনের প্রচারণা ছাড়াই প্রতিবছরের মতো মেলা জমে ওঠে। তবে পুরাতন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে গ্রামীণ সংস্কৃতিভিত্তিক বিনোদনের ব্যবস্থা করা দরকার বলেও তারা মত প্রকাশ করেন। মেলায় আসা জেসমিন বলেন, “বৈশাখ মানেই মেলা। পরিবার নিয়ে এখানে এসে খুব ভালো লাগছে। বাচ্চারাও অনেক আনন্দ করছে।” এবার মেলার বিশেষ আকর্ষণ নাগরদোলা। প্রতিটি স্টলেই থেমে থেমে চলছে দরদাম আর কেনাবেচার প্রাণচাঞ্চল্য। শিশুদের হাসি-আনন্দে আরও রঙিন হয়ে উঠেছে মেলা প্রাঙ্গণ। নাগরদোলা, দোলনা ও নানা বিনোদনমূলক আয়োজন যেন ছোটদের টেনে রাখছে দীর্ঘ সময়। পিঠাপুলি, জিলাপি, ফুচকা, চটপটি, বেলপুরি,ডিমকেক,শরবত, আইসক্রিম, সব মিলিয়ে বাঙালির চিরচেনা স্বাদের এক উৎসব চলছে এখানে। মেলায় অংশ নেওয়া বিক্রেতারাও ব্যস্ত সময় পার করছেন। কেউ ব্যস্ত ক্রেতা সামলাতে, কেউ আবার নতুন পণ্য সাজাতে। তাদের ভাষ্য, সকাল থেকেই বিক্রি সন্তোষজনক, তবে খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভের হিসাব কিছুটা কঠিন হয়ে পড়ছে। শিবমেলা হিসেবে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী "নাইতেরো মেলা"য় দুই শতাধিক দোকানি তাদের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। সকাল থেকেই ঢোলের ছন্দে মুখরিত ছিল পুরো এলাকা। এটি নববর্ষে কর্ণফুলীর প্রথম মেলা হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।