প্রকাশ :: ... | ... | ...

বিশ্বমঞ্চে দাড়াতে চায় রাজন মিয়া


সংযুক্ত ছবি

| ছবি: সাকিব মামুন

যে বয়সে অনেকেই জীবনের ব্যস্ততা, চাকরি আর দায়িত্বের চাপে নিজের স্বপ্নগুলোকে ধীরে ধীরে গুটিয়ে ফেলেন, ঠিক সেই বয়সেই তিনি নিজের সীমাকে প্রতিদিন নতুনভাবে চ্যালেঞ্জ করছেন। যেখানে আমরা কয়েক কিলোমিটার দূরত্ব পাড়ি দিতে যানবাহনের কথা ভাবি, সেখানে তিনি শতশত কিলোমিটার দৌড়ে, সাইকেল চালিয়ে কিংবা সাঁতরে পথ জয় করেন। ২৬–২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রথম স্টেডিয়াম রানে টানা ২৯ ঘণ্টায় ২১৪ কিলোমিটার দৌড়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন মানুষের ইচ্ছাশক্তি চাইলে শারীরিক সীমাবদ্ধতাকেও হার মানাতে পারে। এই অসাধারণ মানুষটির নাম মোহাম্মদ রাজন মিয়া। তিনি খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। কিন্তু তার পরিচয় কেবল একজন শিক্ষক হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি একইসাথে একজন আল্ট্রা রানার, সাঁতারু, সাইক্লিস্ট, উপস্থাপক, সুবক্তা এবং বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী একজন মানুষ। এমনকি শাস্ত্রীয় নৃত্যেও রয়েছে তার অসাধারণ দক্ষতা। সুযোগ পেলে মঞ্চেও তিনি সমান আত্মবিশ্বাসে নিজের শিল্পসত্ত্বাকে তুলে ধরেন। ক্রীড়ার প্রতি ভালোবাসা তার নতুন নয়। স্কুলজীবন থেকেই শুরু হয়েছিল এই যাত্রা। কিশোরগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ২০০৩-০৪ সালে সেরা অ্যাথলেট নির্বাচিত হন তিনি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরও সেই ধারাবাহিকতা থেমে থাকেনি। স্যার এ.এফ রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে ২০০৯-১২ সাল পর্যন্ত একাধিকবার সেরা অ্যাথলেটের স্বীকৃতি পেয়েছেন। শুধু হল পর্যায়েই নয়, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও বারবার নিজেকে প্রমাণ করেছেন। আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতায় ১৫শ, ৫ হাজার এবং ১০ হাজার মিটার দৌড়ে রানার্স-আপ হওয়ার গৌরবও রয়েছে তার অর্জনের ঝুলিতে। ৩৩তম বিসিএসের মাধ্যমে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেওয়ার পর অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন এখানেই শেষ, এবার নিয়মমাফিক জীবন। কিন্তু রাজন মিয়া ভিন্ন মানুষ। তিনি দায়িত্বকে অজুহাত বানাননি; বরং দায়িত্বের মাঝেও নিজের স্বপ্নকে আরও বড় করেছেন। ২০২০ সালে আল্ট্রা রানের জগতে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেন তিনি। এরপর যেন সাফল্যের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে গাজীপুর হাফ ম্যারাথনে পঞ্চম স্থান, কিশোরগঞ্জ ম্যারাথনে চ্যাম্পিয়ন, শমসেরনগর আল্ট্রা ম্যারাথনে প্রথম অংশগ্রহণেই চতুর্থ স্থান অর্জন করেন। একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে আখাউড়া ম্যারাথনে দ্বিতীয় স্থান, নভেম্বরে ভাওয়াল হাফ ম্যারাথনে তৃতীয় স্থান এবং কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ ৫০ কিলোমিটার রানে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন। সাফল্যের সেই ধারা থেমে থাকেনি। ২০২২ সালে মৌলভীবাজার হাফ ম্যারাথনে চতুর্থ স্থান, ২০২৩ সালে বান্দরবান হিল ম্যারাথন ও বান্দরবান ৪২ কিলোমিটার রানে চ্যাম্পিয়ন, ২০২৪ সালে বান্দরবান ৫২ কিলোমিটার আল্ট্রা ম্যারাথনে চ্যাম্পিয়ন হন। আর ২০২৫ সাল যেন তার ক্রীড়া জীবনের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায়— রাঙামাটি ২৫ কিলোমিটার দৌড়ে চ্যাম্পিয়ন, বান্দরবান ৫২ কিলোমিটার আল্ট্রা রানে তৃতীয় স্থান, কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ ১৬১ কিলোমিটার রানে দ্বিতীয় স্থান, বাংলাদেশের প্রথম স্টেডিয়াম রানে ২১৪ কিলোমিটার দৌড়ে তৃতীয় স্থান এবং ঢাকায় অনুষ্ঠিত হাফ আয়রনম্যান প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। তবে রাজন মিয়া শুধু দৌড়বিদ নন। সাঁতারেও তার দক্ষতা বিস্ময়কর। খাগড়াছড়ির চেঙি নদীতে ১১ কিলোমিটার সাঁতার, কাপ্তাই হ্রদে ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ সাঁতার সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন তিনি। যে দেশে এখনও সাঁতার না জানার কারণে বহু মানুষ প্রাণ হারান, সেখানে তিনি নিজের কর্মের মাধ্যমে সচেতনতার বার্তাও ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন পূর্ণাঙ্গ আয়রনম্যান হওয়া। বিশ্বের অন্যতম কঠিন একদিনের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হিসেবে পরিচিত এই চ্যালেঞ্জে একই দিনে ৩.৮ কিলোমিটার সাঁতার, ১৮০.২ কিলোমিটার সাইক্লিং এবং ৪২.২ কিলোমিটার ম্যারাথন সম্পন্ন করতে হয়। মোট ২২৬.৩ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করার এই অসম্ভবকে সম্ভব করার স্বপ্ন বুকে ধারণ করে এগিয়ে চলেছেন তিনি। তার বিশ্বাস সঠিক প্রস্তুতি, পরিশ্রম এবং সুযোগ পেলে একদিন তিনি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নাম আরও উঁচুতে তুলে ধরবেন। তবে এই স্বপ্নের পথে তার সবচেয়ে বড় বাধা প্রতিভা নয়, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা। আন্তর্জাতিক মানের প্রস্তুতি, সরঞ্জাম ও অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজন বড় ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা। তবুও তিনি থেমে যাননি। আর এখানেই রাজন মিয়া অন্যদের থেকে আলাদা। শুধু নিজের স্বপ্ন নিয়েই তিনি ব্যস্ত নন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি নিজ হাতে আচার তৈরি করেন, পরিচিতজনদের কাছে বিক্রি করেন এবং সেই আয়ের পুরোটা দিয়ে দুইজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনার সব খরচ বহন করেন। নিজের সীমিত সামর্থ্য দিয়েও অন্যের ভবিষ্যৎ গড়ার এই নীরব মানবিকতা তাকে আরও বড় করে তোলে। কলেজের শ্রেণিকক্ষেও তিনি সমান অনুপ্রেরণার নাম। অত্যন্ত আন্তরিকতা, গভীর প্রস্তুতি এবং অসাধারণ উপস্থাপনায় তিনি শিক্ষার্থীদের ক্লাস করান। শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, তার কাছ থেকে শেখে স্বপ্ন দেখা, পরিশ্রম করা এবং জীবনের প্রতি দায়বদ্ধতা। আশ্চর্যের বিষয় শিক্ষকতার পাশাপাশি এত বিশাল ক্রীড়া কর্মকাণ্ড, সামাজিক দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে যুক্ত থাকলেও তার প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বে কোনো ব্যাঘাত ঘটে না। বরং কলেজের অধ্যক্ষ তার এই কর্মদক্ষতা, শৃঙ্খলা ও বহুমাত্রিক প্রতিভায় অত্যন্ত সন্তুষ্ট এবং গর্বিত। শিক্ষার্থীরাও তাকে দেখেন একজন শিক্ষক হিসেবে নয়, একজন জীবন্ত অনুপ্রেরণা হিসেবে। মোহাম্মদ রাজন মিয়ার গল্প শুধু একজন ক্রীড়াবিদের গল্প নয়, শুধু একজন শিক্ষকের গল্পও নয়। এটি একজন মানুষের গল্প যিনি দায়িত্ব, স্বপ্ন, মানবিকতা, অধ্যবসায় এবং দেশপ্রেমকে এক সুতোয় গেঁথে নিজের জীবনকে করে তুলেছেন এক অনন্য দৃষ্টান্তে।