| ছবি: ইয়াছির আরফাত
দীর্ঘদিনের জিম্মি দশা থেকে মুক্তি পেলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা। ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি)-এর ধারাবাহিক প্রতিবাদ ও আন্দোলনের মুখে অবশেষে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে চমেকের প্রভাবশালী অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি, বিআরটিএ-এর অভিযান এবং সিটি কর্পোরেশনের কার্যকর পদক্ষেপে এখন থেকে রোগী ও লাশ বহনে থাকছে না কোনো বাধা। দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতাল এলাকায় একটি প্রভাবশালী চক্র অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনায় আধিপত্য বিস্তার করে আসছিল। অভিযোগ ছিল, সিন্ডিকেটের বাইরে থাকা চালকরা রোগী বা মরদেহ পরিবহনের সুযোগ পেতেন না। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং জোরপূর্বক নির্দিষ্ট অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারে বাধ্য করার মতো নানা অভিযোগও ছিল তাদের বিরুদ্ধে। এ পরিস্থিতির বিরুদ্ধে সম্প্রতি এনসিপি প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়। দলটির নেতাকর্মীরা হাসপাতাল এলাকায় গিয়ে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ সংগ্রহ করে সরাসরি প্রতিবাদ করেন। এবং তা বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরেন। প্রথমদিকে সিন্ডিকেট সংশ্লিষ্টরা এসব অভিযোগকে ‘চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে অপপ্রচার’ বলে দাবি করলেও পরে প্রশাসনিক তৎপরতা শুরু হলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। চট্টগ্রামের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত বিষয়টি আমলে নিয়ে ছয় দফা নির্দেশনা প্রদান করেন। নির্দেশনায় অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া তালিকা দৃশ্যমান স্থানে টানানোর ব্যবস্থা, যাত্রীদের হয়রানি বন্ধ, নির্ধারিত নিয়মে গাড়ি পরিচালনা এবং অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়।আদালতের নির্দেশনার পর বিআরটিএ মাঠে নেমে অভিযান পরিচালনা করে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) অভিযানে হাসপাতালের তালিকাভুক্ত ১২০টি অ্যাম্বুলেন্সের বিপরীতে মাত্র ৫০টি অ্যাম্বুলেন্স উপস্থিত পাওয়া গেছে।অ্যাম্বুলেন্সগুলোর অনেকেরই ট্যাক্স টোকেন, রুট পারমিট ও ফিটনেস সনদ মেয়াদোত্তীর্ণ পাওয়া গেছে।বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অনুপস্থিত অ্যাম্বুলেন্সগুলোর তালিকা যাচাই করে পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই ঘটনায় অ্যাম্বুলেন্সের মালিক ও চালকদের মাঝে চরম আতঙ্ক ও হট্টগোল ছড়িয়ে পড়ে। চমেক হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বুধবার সকালে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম উদ্বোধনের সময় হাসপাতালকে ‘শুদ্ধি অভিযানের’ আওতায় আনার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, “দালালচক্র ও রোগী ভাগিয়ে নেওয়া সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। অতীতে রোগীদের কাছ থেকে ৮ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া আদায়ের যে নৈরাজ্য ছিল, তা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে।” মেয়র আরও ঘোষণা দেন যে, ওয়ালিখাঁ মসজিদ থেকে মেডিকেল স্টাফ কোয়ার্টার পর্যন্ত পুরো এলাকাকে ফুটপাত দখলমুক্ত ও ‘পেডেস্ট্রিয়ান জোন’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এছাড়া পুরো এলাকাকে ধূমপান ও মাদকমুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে কর্তৃপক্ষ। হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আদালত, সিটি কর্পোরেশন ও বিআরটিএ-এর এই সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অরাজকতা দূর হবে।রোগী ও তাদের স্বজনদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমে আসবে এবং চমেক হাসপাতাল পুনরায় প্রকৃত সেবার কেন্দ্রে পরিণত হবে।