চট্টগ্রাম নগরীর রিয়াজউদ্দিন বাজার, চকবাজার কিংবা বহদ্দারহাট—সবখানেই এখন একই চেনা দৃশ্য। বাজারের থলে হাতে ক্রেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ, আর বিক্রেতাদের মুখে 'সরবরাহ কম' কিংবা 'পাইকারিতে বাড়তি দামের' চিরচেনা অজুহাত। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বন্দর নগরীর প্রতিটি কাঁচাবাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যেভাবে লাগামহীনভাবে বেড়েছে, তাতে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। আয়ের সাথে ব্যয়ের সামঞ্জস্য মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ ক্রেতারা। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম ১০% থেকে শুরু করে ৫০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। চাল ও ডাল: মোটা চালের দাম কেজিতে বেড়েছে ৪ থেকে ৬ টাকা। আর সরু মিনিকেট বা নাজিরশাইল চাল এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। মসুর ডালের দামও কেজিতে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ভোজ্যতেল ও পেঁয়াজ: সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ৫ থেকে ৮ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে বেশি অস্থিরতা দেখা গেছে পেঁয়াজ ও রসুনের বাজারে। আমদানি করা পেঁয়াজের অজুহাতে দেশি পেঁয়াজের দামও এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ১৫-২০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মাছ-মাংসের বাজারে হাহাকার: ব্রয়লার মুরগি ও সোনালী মুরগির দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ছাড়িয়েছে অনেক আগেই। গরুর মাংসের দাম প্রতি কেজি ৮০০-৮৫০ টাকা এবং খাসির মাংস ১০০০-১১০০ টাকায় ঠেকেছে। সাগরের মাছের অন্যতম বড় জোগানদার এই চট্টগ্রামেও সাধারণ রুই, কাতল বা পাঙাশ মাছের দামও কেজিতে ৩০-৫০ টাকা বেড়েছে। আড়তদার বনাম খুচরা বিক্রেতা: ব্লেম গেমের ফাঁদে ক্রেতা চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ এবং রিয়াজউদ্দিন বাজারে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে এক অদ্ভুত লুকোচুরি খেলা। পাইকারি ব্যবসায়ীদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে বুকিং দর বৃদ্ধি, ডলার সংকট এবং সাম্প্রতিক সময়ে পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে আড়ত পর্যায়ে দাম কিছুটা বেড়েছে। খাতুনগঞ্জের এক ব্যবসায়ী জানান, "আমাদের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, তাই কম দামে বিক্রির সুযোগ নেই।" তবে খুচরা বিক্রেতাদের ওপর নজরদারি করতেই বেরিয়ে আসে ভিন্ন চিত্র। পাইকারি বাজারে যে পণ্যের দাম বাড়ে ২ টাকা, খুচরা বাজারে এসে তা রাতারাতি বেড়ে যায় ১০ টাকা। রিয়াজউদ্দিন বাজারের এক খুচরা বিক্রেতার সরল স্বীকারোক্তি, "পাইকারিতে দাম বাড়লে আমাদের ঝুঁকি বাড়ে। লস ঠেকাতে একটু বাড়িয়েই বেচতে হয়।" মাঝখান থেকে পকেট কাটছে সাধারণ ভোক্তার। ৩. মধ্যস্বত্বভোগী ও 'সিন্ডিকেট' কারসাজি অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, কাঁচামাল ও শাকসবজির ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় সমস্যা 'মধ্যস্বত্বভোগী' বা ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য। দোহাজারী, সীতাকুণ্ড বা উত্তরবঙ্গ থেকে যে সবজি চট্টগ্রামের আড়তে আসে, তা হাতবদল হয় অন্তত তিন থেকে চারবার। সীতাকুণ্ডের একজন কৃষক যে বেগুন ক্ষেত থেকে ৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি করছেন, সেটি চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট বা কাজীর দেউড়ি বাজারে আসতে আসতে হয়ে যাচ্ছে ৮০ টাকা। এই ৫০ টাকার ব্যবধান পুরোটাই চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী ও বাজারের অদৃশ্য 'সিন্ডিকেট'-এর পকেটে। ক্রেতাদের কণ্ঠস্বর: "বাঁচব কীভাবে?" চকবাজারে বাজার করতে আসা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকুরিজীবী মোহাম্মদ ইকবালের সাথে কথা বললে তিনি ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন: "গত এক বছরে বেতন বাড়েনি এক টাকাও। কিন্তু প্রতি মাসে বাজারের বাজেট দ্বিগুণ হচ্ছে। আগে সপ্তাহে একদিন মাংস কিনতাম, এখন মাসে একদিন কেনাও বিলাসিতা। আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে।" একই চিত্র দেখা গেল বহদ্দারহাটে। রিকশাচালক করিম মিয়া আধা কেজি আলু আর একটা ছোট ডিমের ডজন নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। তিনি বলেন, "কামাই যা করি, তার সবই তো পেটে চলে যায়। ওষুধ বা বাচ্চার খাতা-কলম কিনব কীভাবে?" বাজার মনিটরিং: খাতা-কলমে সক্রিয়, বাস্তবে ঢিলেঢালা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মাঝেমধ্যে নগরীর বাজারগুলোতে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করলেও, তার প্রভাব স্থায়ী হচ্ছে না বলে অভিযোগ ক্রেতাদের। অভিযানের দিন দাম কিছুটা কম থাকলেও, পরের দিনই বাজার আবার পুরোনো চেহারায় ফিরে যায়। নিয়মিত এবং কঠোর বাজার মনিটরিংয়ের পাশাপাশি পাইকারি ও খুচরা মূল্যের ব্যবধান নির্দিষ্ট করে দেওয়ার দাবি তুলেছেন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রামের নেতৃবৃন্দ। নিত্যপণ্যের এই বেসামাল পরিস্থিতি কেবল একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি এখন সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই। অবিলম্বে খাতুনগঞ্জসহ চট্টগ্রামের প্রধান পাইকারি ও খুচরা বাজারগুলোতে কঠোর নজরদারি, পরিবহন চাঁদাবাজি বন্ধ এবং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নিলে বন্দরনগরীর নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রা আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে।