| ছবি: মোহাম্মদ সামির
বর্তমান সময়ে সমাজের অন্যতম বড় সামাজিক সংকট হিসেবে দেখা দিচ্ছে দাম্পত্য জীবনের অশান্তি ও পারিবারিক অস্থিতিশীলতা। একসময় পরিবার ছিল ভালোবাসা, বিশ্বাস ও মানসিক প্রশান্তির নিরাপদ আশ্রয়স্থল। কিন্তু আধুনিক জীবনযাত্রার চাপ, ব্যস্ততা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাবে অনেক পরিবারে কমে যাচ্ছে সুখ ও শান্তি। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে অধিকাংশ দাম্পত্য সম্পর্কেই কোনো না কোনোভাবে মানসিক দূরত্ব, ভুল বোঝাবুঝি কিংবা অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর জীবন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহারও পারিবারিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে থাকলেও মানসিকভাবে দূরে সরে যাচ্ছেন। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আগের মতো খোলামেলা আলোচনা, একসঙ্গে সময় কাটানো কিংবা পারস্পরিক অনুভূতি ভাগাভাগির প্রবণতা কমে যাচ্ছে। ফলে ছোট ছোট বিষয় থেকেও বড় ধরনের বিরোধ তৈরি হচ্ছে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, দাম্পত্য জীবনে অশান্তির অন্যতম কারণ হলো ধৈর্যের অভাব এবং একে অপরকে বুঝতে না চাওয়া। অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক চাপ, চাকরিগত অনিশ্চয়তা, পারিবারিক হস্তক্ষেপ, সন্দেহ এবং অহংকার সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলছে। আগে যেখানে পরিবারে প্রবীণদের পরামর্শ ও মূল্যবোধ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখত, বর্তমানে অনেক পরিবারে সেই সামাজিক ও নৈতিক চর্চাও কমে গেছে। রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক ব্যক্তি জানান, সারাদিন কাজের চাপের পর বাসায় ফিরেও মানসিক শান্তি পাওয়া যায় না। মোবাইল ফোন ও ব্যস্ততার কারণে পরিবারের সঙ্গে আগের মতো সময় কাটানো হয় না। এ থেকেই অনেক ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। এক গৃহিণী বলেন, বর্তমানে মানুষ খুব দ্রুত রেগে যায় এবং ছাড় দিতে চায় না। স্বামী-স্ত্রী দুজনের মধ্যেই ধৈর্য ও সহনশীলতা কমে গেছে। ফলে ছোট সমস্যাও বড় অশান্তিতে রূপ নেয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পারস্পরিক সম্মান, বিশ্বাস ও সময় দেওয়া। শুধু অর্থনৈতিক সফলতা নয়, মানসিক বন্ধন ও পারিবারিক মূল্যবোধও একটি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার মূল ভিত্তি। তারা বলেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে খোলামেলা আলোচনা, একে অপরের প্রতি সহানুভূতি এবং ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা পারিবারিক শান্তি ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সমাজ সচেতন মহল বলছে, পরিবার সমাজের মূল ভিত্তি। পরিবারে শান্তি না থাকলে তার প্রভাব পড়ে সন্তানদের মানসিক বিকাশ, সামাজিক আচরণ এবং পুরো সমাজ ব্যবস্থার ওপর। তাই দাম্পত্য জীবনের সংকট দূর করতে শুধু ব্যক্তি নয়, পরিবার ও সমাজকেও একসঙ্গে সচেতন হতে হবে। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, সুখী পরিবার গড়ে ওঠে ভালোবাসা, ত্যাগ, ধৈর্য ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও যদি পরিবারকে সময় দেওয়া যায় এবং সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে অনেক অশান্তিই দূর করা সম্ভব।