প্রকাশ :: ... | ... | ...

শুভ নববর্ষ ১৪৩৩ উৎসবে আনন্দে উল্লাসে মাতবে বৈশাখ


সংযুক্ত ছবি

বাঙালি জাতির যেসব বড় উৎসব রয়েছে তার মধ্যে একমাত্র অসাম্প্রদায়িক গৌরবময় উৎসবের উল্লাস বৈশাখ।প্রতিবছর ইংরেজি মাসের ১৪ এপ্রিল বাংলা পঞ্জিকার প্রথম তারিখ পহেলা বৈশাখ। আজ সেই পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন রোজ মঙ্গলবার।একমাত্র পহেলা বৈশাখে মুসলিম হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান চাকমা সহ সকল জাতি ধর্ম বর্ণ মিলে এই দিনটিকে গৌরবের সাথে উদযাপন করে।বাঙালি জাতি মাছে ভাতে যে বাঙালি তা ভুলে যেতে বসলেও শুধুমাত্র পহেলা বৈশাখে পান্তা ভাত ইলিশ মাছ শুটকি ভর্তা আলুর ভর্তা শুকনা মরিচ পুড়া খেয়ে বাঙালির গৌরবের জাতির স্বাদ ভোগ করে। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাওয়া মানুষের জীবন যাপনে যেমন পরিবর্তন এসেছে ঠিক তেমনি পহেলা বৈশাখেও একে অপরকে শুভেচ্ছা জানাতে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পরিবর্তন এসেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক মেসেঞ্জার হোয়াটস্যাপ টুইটার বিভিন্ন প্রযুক্তি যোগাযোগ মাধ্যমে একে অপরকে শুভেচ্ছা নিবেদন করেন। দিনটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বসহকারে উদযাপন করে ব্যবসায়ী ও পাহাড়ি অঞ্চলের ভিন্ন প্রজাতির।এই দিনটিতে সকল ব্যবসায়ী তাদের হালখাতা নতুন করে শুরু করেন।পুরনো বছরের দেনা-পাওনার হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করে নতুন লাল কাপড়ে মোড়ানো খাতায় নতুন হিসাব শুরু করা হয়। গ্রামীণ ও শহরের ব্যবসায়ীরা গ্রাহকদের মিষ্টিমুখ করিয়ে এই উৎসব উদযাপন করেন, যা ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্ক ও বিশ্বাস সুদৃঢ় করেন। চট্টগ্রাম মানেই পাহাড়ি অঞ্চল।আর পাহাড়ে পাহাড়ে উৎসবে আমেজে আনন্দে উদ্বেলিত হয় পহেলা বৈশাখ।পহেলা বৈশাখ আগমন উপলক্ষে পাহাড়িরা পহেলা বৈশাখের নির্দিষ্ট পোশাক ক্রয় করেন। পাহাড়ি নারীরা সাধারণত রঙিন ও নকশাদার ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান করেন। যেমন,চাকমা নারীরা পিনন ও হাদি পরেন। মারমা নারীরা থামি ও অ্যাংজি পরিধান করেন।ত্রিপুরা নারীরা রিসা ও রিগনাই ব্যবহার করেন।পোশাকগুলো সাধারণত হাতে বোনা, উজ্জ্বল রঙের এবং নকশায় ভরপুর, যা উৎসবের আমেজকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।পুরুষরা সাধারণত লুঙ্গি বা ধুতি সদৃশ কাপড় এবং কখনও ঐতিহ্যবাহী শার্ট বা ফতুয়া পরেন। অনেকে মাথায় পাগড়িও ব্যবহার করেন, যা তাদের সংস্কৃতির অংশ।পহেলা বৈশাখে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর খাবার বেশ বৈচিত্র্যময় হয়।তারা সাধারণত—পাজন (বিভিন্ন সবজির মিশ্র রান্না) বাঁশকোঁড়ার তরকারি শুঁটকি মাছের বিভিন্ন পদ পিঠা ও মিষ্টান্ন চিড়ার তৈরি খাবার।এছাড়া অনেক জায়গায় ঐতিহ্যবাহী পানীয়ও পরিবেশন করা হয়। পাহাড়ি সংস্কৃতিতে অতিথি আপ্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পহেলা বৈশাখে অতিথিদের আন্তরিকভাবে স্বাগত জানানো হয় নিজ হাতে রান্না করা খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়।প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনদের আমন্ত্রণ জানানো হয়।একসঙ্গে বসে খাওয়া ও আনন্দ ভাগাভাগি করা হয়।অনেক এলাকায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাচ-গান এবং খেলাধুলার আয়োজন করা হয়, যেখানে সবাই মিলে অংশগ্রহণ করে। সব মিলিয়ে, পহেলা বৈশাখে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পোশাক, খাবার ও আপ্যায়ন তাদের ঐতিহ্য ও আতিথেয়তার উজ্জ্বল প্রকাশ ঘটায়। এটি শুধু একটি উৎসব নয়, বরং সামাজিক বন্ধন ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের এক অনন্য উদাহরণ।অন্যান্য বাঙালিরা পুরুষ পায়জামা ও বৈশাখী পাঞ্জাবি ফতোয়া এবং নারীরা লাল সাদা সবুজ মিলি শাড়ি পরিধান করেন।চট্টগ্রাম নগর জুড়ে উৎসব আনন্দ ভরপুর হয়ে উঠে পহেলা বৈশাখ।পুরনো বছরের গ্লানি ঝেড়ে নতুন সূচনার প্রত্যাশায় নগরবাসী নানা আয়োজনে মেতে উঠেছে।শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও উন্মুক্ত প্রাঙ্গণগুলোতে মানুষের ঢল নামে সকাল থেকেই। বাংলা নববর্ষ আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রাণস্পন্দন। বৈশাখের বর্ণিল সাজ প্রতিটি বাঙালির জীবনে নিয়ে আসে উৎসবের আমেজ আর অসাম্প্রদায়িক এক অনুভূতি।পহেলা বৈশাখ উদযাপন উপলক্ষে জেলা প্রশাসন, চট্টগ্রাম ঐতিহ্যবাহী ডিসি হিল প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য কর্মসূচি গ্রহণ করেন। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রায় দেড় কিলোমিটারজুড়ে সড়কে এক দিন আগেই আল্পনা অঙ্কনের ব্যতিক্রমী আয়োজন করেন। চট্টগ্রাম নগরের সার্কিট হাউস থেকে শুরু হয়ে লাভলেইন ও কাজীর দেউড়ি হয়ে ঐতিহ্যবাহী ডিসি হিল পর্যন্ত বিস্তৃত এই আয়োজন উৎসবমুখর পরিবেশে শেষ করেছে জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন।বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা শিল্পকলা একাডেমি এবং শিশু একাডেমির শিক্ষার্থী ও শিল্পীরা এতে অংশ নিবেন আজ। তারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে লতাপাতা, ফুল, পাখি ও লোকজ মোটিফের মাধ্যমে বাঙালির ঐতিহ্য তুলে ধরবেন। জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম গত রাতে বলেন, “আমরা আসলে দেড় কিলোমিটার যে আল্পনা করছি, সেখানে আপনারা দেখছেন বিভিন্ন রঙে আমাদের এই সড়ক রাঙানো হচ্ছে। আমরা আমাদের জীবনকেও এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও সেভাবে রাঙিয়ে তুলতে চাই।” তিনি বলেন, আমাদের এই সমাজে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধসহ যারা বসবাস করে, তাদের প্রত্যেকের আলাদা রঙ থাকলেও উৎসব পালনের ক্ষেত্রে আমরা একতাবদ্ধ। আমরা একত্রে মিলিত হয়ে আমাদের উৎসব আয়োজন করি। তিনি আরও বলেন, সমাজে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধসহ সব সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করে এবং উৎসবের সময় তারা ঐক্যবদ্ধ হয়—এই আয়োজন সেই সম্প্রীতির প্রতীক। তিনি আরও যোগ করেন, “এখানে মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান সকলে মিলে এবং অন্যান্য যারা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী রয়েছে, বৌদ্ধসহ যারা আছে—আমরা সকলে মিলে একটি সুন্দর সমাজে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করি।” তিনি আরও বলেন, আমরা সম্মিলিতভাবে দেশের জন্য কাজ করি এবং আমাদের সংস্কৃতির যে মেলবন্ধন আছে, সেটি বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে চাই। আমাদের সংস্কৃতির যে গৌরব এবং ঐতিহ্য, সেটি যেন আগামী প্রজন্ম ধরে রাখে—সেজন্য আমরা তাদের উৎসাহিত করছি। ভোরের আলো ফুটতেই চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ডিসি হিল-এ শুরু হয় বর্ষবরণের মূল আয়োজন। সেখানে সম্মিলিত কণ্ঠে ‘এসো হে বৈশাখ’ গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে এলাকা পরিণত হয় এক মিলনমেলায়। রঙিন পাঞ্জাবি, শাড়ি ও ফুলের সাজে সেজে ওঠা মানুষজনের উচ্ছ্বাসে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ। এছাড়া সিআরবি (রেলওয়ে হিল) এলাকাতেও বসে জমজমাট আয়োজন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, লোকসংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তিতে অংশ নেয় স্থানীয় শিল্পীরা। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা নিয়ে অংশ নেয় উৎসবে, যা পুরো শহরে এক আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি করে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হয় উৎসবমুখর পরিবেশে। শিক্ষার্থীরা মঙ্গল শোভাযাত্রা, বৈশাখী মেলা এবং ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার আয়োজন করে। বিশেষ করে গ্রামীণ সংস্কৃতির নানা উপাদান—পুতুল নাচ, লাঠিখেলা, ও লোকজ সংগীত—নগরজীবনে নতুন মাত্রা যোগ করে। বৈশাখী উৎসবকে ঘিরে নগরীর বিভিন্ন স্থানে বসেছে অস্থায়ী মেলা। এসব মেলায় পাওয়া যাচ্ছে দেশীয় হস্তশিল্প, মাটির তৈরি পণ্য, পাখা, বাঁশের সামগ্রীসহ নানা ঐতিহ্যবাহী জিনিসপত্র। পাশাপাশি খাবারের স্টলগুলোতে ভিড় জমাচ্ছে মানুষ। পান্তা-ইলিশ, ভর্তা, পিঠা ও বিভিন্ন দেশীয় খাবারের স্বাদ নিতে পরিবার-পরিজন নিয়ে বের হয়েছেন অনেকে।সম্মিলিত নববর্ষ উদযাপন পরিষদ, চট্টগ্রাম’ এর ব্যানারে সিআরবিতে অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছে ‘ আর এখানকার আয়োজনে ‘সার্বিক ব্যবস্থাপনায়’ নতুন করে সম্পৃক্ত হয়েছে চট্টগ্রাম রেলওয়ে অফিসার্স ক্লাব। ১৯৭৮ সাল থেকে ডিসি হিলে বর্ষ বিদায় ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ‘সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদ, চট্টগ্রাম’। গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পহেলা বৈশাখের আগের রাতে হামলা চালিয়ে মঞ্চ ভাঙচুরের পর সেই অনুষ্ঠান আর হয়নি। এবার পরিষদের পক্ষ থেকে পহেলা বৈশাখ আয়োজনের বিষয়ে জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়। এরপর ২৮ মার্চ প্রস্তুতি সভায় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, ডিসি হিলে জেলা প্রশাসন পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান আয়োজন করবে। এছাড়া বিএনপিপন্থি সাংস্কৃতিক সংগঠন জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) এই আয়োজনে সম্পৃক্ত হতে চাওয়ায় বৈশাখের আয়োজনে অতীতে অংশ নেওয়া কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের সরে যাওয়ার কথা বলে। এরপর ২ এপ্রিল নিজেরা পৃথক প্রস্তুতি সভা করে সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদের পক্ষে ডিসি হিলের পরিবর্তে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আয়োজন করার কথা জানানো হয়। পরিষদের সমন্বয়ক সুচরিত দাশ খোকন বলেন, “এবার আয়োজন করছে জেলা প্রশাসন। আমরা সহযোগিতা করছি। শহীদ মিনারে ‘নিরাপত্তার ঘাটতির’ কথা বলে পুলিশ আমাদের অনুমতি দেয়নি। “পরে জাসাসও আলোচনায় বসতে চেয়েছে। তাদের সাথে আলোচনা শেষে আমরা ডিসি হিলের আয়োজনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছি।” জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ডিসি হিলের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে প্রায় অর্ধ শত সাংস্কৃতিক সংগঠন অংশ নেবে। এছাড়া বিকেলে চিশতি বাউল সংগীত পরিবেশন করবেন।এ বিষয়ে জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার সৈয়দ আয়াজ মাবুদ বলেন, “আয়োজন নিয়ে কয়েকটি পক্ষ এক হতে পারেনি শুরুতে। যেহেতু ডিসি হিলে বর্ষবরণ চট্টগ্রামের ঐতিহ্যের অংশ, তাই সেটা কারো বাধায় বা অনাগ্রহে বন্ধ হয়ে যাক, সেটা আমরা চাইনি। সে কারণে জেলা প্রশাসক মহোদয় উদ্যোগী হয়ে সবাইকে নিয়েই আয়োজন করছেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে, পাশাপাশি রয়েছে সিসিটিভি নজরদারি। ফলে উৎসবমুখর পরিবেশের পাশাপাশি নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সামগ্রিকভাবে বলা যায়, পহেলা বৈশাখকে ঘিরে চট্টগ্রাম এখন এক প্রাণবন্ত নগরীতে পরিণত হয়েছে। সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আনন্দের মেলবন্ধনে এই উৎসব শুধু একটি দিন নয়, বরং বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে নতুন করে সামনে আসে। নতুন বছরের প্রথম দিনটি তাই হয়ে ওঠে সকল ভেদাভেদ ভুলে একসাথে আনন্দ ভাগাভাগি করার অনন্য উপলক্ষ।