চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন টার্মিনাল উন্নয়ন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বন্দরের সেবা ও দক্ষতার মান উন্নয়ন এবং নৌপরিবহন খাতে দক্ষ জনবল তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, চট্টগ্রাম ও মোংলাকে ঘিরে যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা কাজে লাগাতে সংশ্লিষ্ট সব খাতকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। সেবার মান ও দক্ষতা বাড়াতে না পারলে বিপুল সম্ভাবনাও একসময় মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক হাব হচ্ছে। মোংলা পোর্ট—আমি গিয়েছি, সেখানেও অর্থনৈতিক হাব হচ্ছে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল হচ্ছে, বিদেশি বিনিয়োগ আসছে। একই সময়ে যদি আমাদের সেবা এবং দক্ষতার মান বাড়াতে না পারি, তাহলে এটা আবার মুখ থুবড়ে পড়বে।” তিনি বলেন, সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগাতে সরকার সমন্বিতভাবে কাজ করছে। বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নে বিদেশি বিনিয়োগের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী লালদিয়া টার্মিনাল উন্নয়নে ডেনমার্কের এপি মোলারের সঙ্গে চুক্তির বিষয়টি উল্লেখ করেন। পাশাপাশি টার্মিনাল ওয়ান নিয়ে সিঙ্গাপুরের পিএসএ-এর সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) হওয়ার কথাও জানান তিনি। খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “আমার মনে হয়, তিন-চার মাসের মধ্যে আমরা একটা সিদ্ধান্তে (কনক্লুশন) চলে আসতে পারছি। আমাদের চেষ্টা আছে, আমরা এই সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগাতে চাই।” বন্দরকেন্দ্রিক অবকাঠামোতে বিদেশি বিনিয়োগের এ উদ্যোগকে দেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবস্থাপনা ও লজিস্টিকস খাতের সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নতুন টার্মিনাল ও আধুনিক অবকাঠামো গড়ে উঠলে পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি বন্দরসেবার গতি ও দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে। দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের বড় অংশ চট্টগ্রাম বন্দরনির্ভর। এ কারণে চট্টগ্রামকে ঘিরে শিল্প, বাণিজ্য, লজিস্টিকস ও বিনিয়োগের পরিধি বাড়ছে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং বিদেশি বিনিয়োগের সঙ্গে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি সরাসরি সম্পর্কিত। অর্থনীতিবিদ ও বন্দরসংশ্লিষ্টদের মতে, শিল্প ও বিনিয়োগ বাড়লেও বন্দরের সেবা যদি সেই অনুপাতে দ্রুত ও দক্ষ না হয়, তাহলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। এতে পণ্য খালাস, পরিবহন ও সরবরাহের সময় এবং ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, দক্ষ জনবল ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু চট্টগ্রাম নয়, মোংলা বন্দরকেও ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের কথা তুলে ধরেছেন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মোংলাকে কেন্দ্র করেও অর্থনৈতিক হাব ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠছে এবং সেখানে বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ফলে দেশের দুই প্রধান সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে সমন্বিত বন্দর, শিল্প ও লজিস্টিকস অবকাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিল্প ও বাণিজ্য কার্যক্রমকে সমুদ্রবন্দরগুলোর সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা সম্ভব হতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, শুধু নতুন টার্মিনাল নির্মাণ বা বিনিয়োগ আনলেই হবে না; এসব অবকাঠামো পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল এবং দ্রুত ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে বন্দর পরিচালনা, জাহাজ ব্যবস্থাপনা, কার্গো হ্যান্ডলিং, লজিস্টিকস এবং নৌপরিবহন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত জনবলের চাহিদা বাড়বে। এ ক্ষেত্রে দেশীয় দক্ষ জনবল তৈরি করা গেলে বিদেশি বিশেষজ্ঞনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানো সম্ভব হবে। চট্টগ্রাম বন্দরের নতুন টার্মিনাল, বিদেশি বিনিয়োগ, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্পায়ন, লজিস্টিকস অবকাঠামো এবং দক্ষ জনবল—সবগুলো বিষয়কে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রামকে প্রকৃত অর্থে অর্থনৈতিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে হলে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সড়ক-রেল যোগাযোগ, পণ্য পরিবহন, কাস্টমস কার্যক্রম, লজিস্টিকস সেবা, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।