ক্ষমতা গ্রহণের পাঁচ মাসের মাথায় রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও প্রশাসনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে আগামী সপ্তাহেই পদত্যাগ করতে পারেন রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বঙ্গভবনে অনানুষ্ঠানিক বার্তা পৌঁছেছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। যদিও সরকারের দায়িত্বশীল কোনো ব্যক্তি এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানাননি। বঙ্গভবন সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতির দপ্তরে সম্ভাব্য সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রস্তুতিমূলক আলোচনা চলছে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর হলেও পদত্যাগের সুযোগ রয়েছে। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে স্পিকারের উদ্দেশে নিজ স্বাক্ষরে পদত্যাগপত্র জমা দিতে হবে। পদটি শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। সরকারি মহলে নীরবতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি মালয়েশিয়া ও চীন সফর শেষে দেশে ফিরেছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই ছিল তাঁর প্রথম বিদেশ সফর। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী বিদেশ সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সফর সম্পর্কে অবহিত করেন। তবে এবার প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন—এমন কোনো তথ্য বঙ্গভবন বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় প্রকাশ করেনি। বুধবার সরকারের একাধিক মন্ত্রী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের বিষয়ে তাঁদের কাছে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য নেই। তবে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ে সম্ভাব্য নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম নিয়ে আলোচনা চলছে বলে রাজনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। স্বাস্থ্যগত কারণই প্রধান কারণ? বঙ্গভবনের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সম্প্রতি রাষ্ট্রপতির শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় চিকিৎসকেরা তাঁকে পূর্ণ বিশ্রামের পরামর্শ দিয়েছেন। গত কয়েক সপ্তাহে তিনি দুই দফা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়েছেন। এর আগে গত মে মাসে উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি লন্ডন সফরও করেন। সফরে তাঁর পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক, স্টাফ নার্স এবং বঙ্গভবনের কর্মকর্তারা সঙ্গে ছিলেন। এ অবস্থায় স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন বলে আলোচনা জোরালো হয়েছে। আগেই সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন গত ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন জানিয়েছিলেন, নির্বাচন শেষ হওয়ার পর তিনি দায়িত্ব ছাড়তে আগ্রহী। তিনি বলেছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তিনি নিজেকে "অপমানিত" মনে করেছেন এবং সাংবিধানিক দায়িত্বের কারণেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। ২০২৩ সালে দায়িত্ব গ্রহণ, মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত মোঃ সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পাঁচ বছরের মেয়াদ অনুযায়ী তাঁর দায়িত্ব শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের ২৪ এপ্রিল। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই ছাত্র-জনতার একটি অংশ তাঁর পদত্যাগের দাবি জানিয়ে আসছিল। সে সময় বিএনপি এ দাবির বিরোধিতা করলেও পরবর্তীতে তাঁর কাছেই নতুন সরকার শপথ গ্রহণ করে। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক বিধান বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের গোপন ভোটে নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য ন্যূনতম বয়স ৩৫ বছর হতে হবে এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে। রাষ্ট্রপতির পদ পদত্যাগ, অপসারণ বা অন্য কোনো কারণে শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচন পরিচালনা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার, যিনি স্পিকারের সঙ্গে পরামর্শ করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। যদি রাষ্ট্রপতি পদে একমাত্র একজন বৈধ প্রার্থী থাকেন, তাহলে ভোটগ্রহণ ছাড়াই তাঁকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। সাম্প্রতিক দায়িত্ব পালন অব্যাহত ছিল সব জল্পনা-কল্পনার মধ্যেও রাষ্ট্রপতি নিয়মিত সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। গত মঙ্গলবার বঙ্গভবনে বিদায়ী নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি। এছাড়া ১৫ জুলাই 'জুলাই শহীদ দিবস' উপলক্ষে বাণী প্রদান করেন। এর আগে জুন মাসে ভারতের নতুন হাইকমিশনার এবং মরক্কোর নতুন রাষ্ট্রদূতের পরিচয়পত্রও গ্রহণ করেন। এখন সবার নজর বঙ্গভবনের দিকে রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগ নিয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা না এলেও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে। আগামী সপ্তাহে যদি পদত্যাগপত্র জমা দেওয়া হয়, তবে সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেবেন এবং পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে সরকার কিংবা বঙ্গভবনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।