মালয়েশিয়াগামী একটি যাত্রীবাহী ট্রলার আন্দামান সাগরে ডুবে যাওয়ার ঘটনায় কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলা থেকে অন্তত ১২ জন নিখোঁজ রয়েছেন। এ ঘটনায় পুরো এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। নিখোঁজদের পরিবারগুলো দিন কাটাচ্ছেন চরম উদ্বেগ, আতঙ্ক আর অপেক্ষার প্রহর গুনে। নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন, রাজাখালী ইউনিয়নের মিয়ার পাড়া এলাকার আব্দু রহিমের ছেলে মো.বেলাল উদ্দিন, আহমদ ছবির ছেলে মো. এহেসান, আব্দুল মালেকের ছেলে রহিম, হাজিরপাড়ার শহিদুল ইসলামের ছেলে সোহেল, নুরুল আমিনের ছেলে রাশেদুল ইসলাম, নতুন ঘোনা গোদারপাড়ার বাদশা মিয়ার ছেলে রহুল কাদের, শহিদুল্লাহর ছেলে মানিক এবং আব্দুল হক কোম্পানির এক আত্মীয়। এছাড়া টৈটং ইউনিয়নের পেন্ডারপাড়া ও হিরাবুনিয়াপাড়া থেকে আরও ২ জন নিখোঁজ রয়েছেন। অন্যদিকে, বাঁশখালী উপজেলার পুইছড়ি ইউনিয়নের আরও অন্তত ৫ জন নিখোঁজ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ ও ৬ এপ্রিল পৃথকভাবে এসব যুবক সাগর পথে মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। পরে ৯ এপ্রিল আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটে। প্রশাসনের তথ্যমতে, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত আড়াই শতাধিক যাত্রী নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজ এহেসানের মা মোহসেনা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার ছেলের সাথে শেষ কথা হয়েছিল ট্রলারে ওঠার পর। সে বলেছিল মা, চিন্তা করো না, পৌঁছে ফোন দিব। সেই ফোন আর আসেনি। এখন শুধু অপেক্ষা করছি, আমার ছেলেটা ফিরে আসুক। সোহেলের বাবা শহিদুল ইসলাম বলেন, আমার ছেলেটা পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিল। ভালো একটা জীবনের আশায় গেছে। এখন তার কোনো খোঁজ নেই আমরা বাঁচব কিভাবে?। নিখোঁজ রহিমের স্ত্রী আজবাহার বেগম বলেন, যাওয়ার সময় বলছিল তোমাদের ভালো রাখব। এখন আমি কাকে নিয়ে বাঁচব? ছোট ছোট বাচ্চাগুলোর মুখের দিকে থাকাতে পারি না। রাশেদুল ইসলামের নানী ছফুরা খাতুন বলেন, নাতিটা আমার চোখের সামনে বড় হইছে। বিদেশে গিয়ে কিছু করবে এই স্বপ্ন নিয়া ছিল। আল্লাহর কাছে একটাই দোয়া আমার নাতিরে যেন আমার বুকে ফিরায়া দে। অন্যদিকে, বেলালের মা ছালেহা বেগম ও স্ত্রী সুমি আক্তার বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। স্বজনরা জানান, বেলাল সংসারের হাল ধরতেই এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়িয়েছিলেন। এদিকে একই ট্রলারে থাকা হামিদা বেগমের ছেলে মো. হাসান জীবিত ফিরে আসায় তাদের পরিবারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে নিখোঁজদের পরিবারের মাঝে এখনো অজানা শঙ্কা আর কান্না থামছে না। রাজাখালী ইউপির সদস্য নেজাম উদ্দিন নেজু জানান, নিখোঁজদের পরিবারের পাশে তারা সার্বক্ষণিক আছেন এবং তাদের খোঁজে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি দালালদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, টেকনাফ কেন্দ্রিক একটি সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারী চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। তারা পেকুয়া ও বাঁশখালীর দরিদ্র ও হতাশাগ্রস্ত যুবকদের টার্গেট করে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর প্রলোভন দেখায়। স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে, টৈটং ইউনিয়নের কেরুণছড়ি এলাকার আবুল হোসেন, তার মেয়ে হাসিনা বেগম ও জামাই হাবিবুর রহমানসহ আরও কয়েকজন এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। এছাড়া গুধিকাটা এলাকার আবু তাহেরের ছেলে বত, বাঁশখালীর ছনুয়া এলাকার ফোরকান ও রুবেলও এই সিন্ডিকেটে সক্রিয় বলে অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, রাজাখালী মাতবর পাড়ার বাসিন্দা আহমদ ছবির মেয়ের জামাই এবং টেকনাফের নুরুল আলমসহ কয়েকজন দালাল সরাসরি লোক সংগ্রহ করে ট্রলারে তুলে দেয়। তাদের সহযোগী হিসেবে সাহাব উদ্দিন, ফিরোজ ও সাইফুলের নামও উঠে এসেছে। জনপ্রতি ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা অগ্রিম নিয়ে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে এসব যুবকদের সাগরপথে পাঠানো হয়। কিন্তু সেই স্বপ্ন অনেক সময়ই রূপ নেয় মৃত্যুফাঁদে। সরেজমিনে নিখোঁজদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা কেউ লবণ শ্রমিক, কেউ জেলে, আবার কেউ বেকার ছিলেন। অনেকেই পরিবারের অজান্তেই দালালদের প্রলোভনে পড়ে এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় পা বাড়ান। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে মানবপাচার চক্র সক্রিয় থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। পেকুয়া থানার ওসি খাইরুল আলম জানান, পেকুয়া থানা এলাকার রাজাখালী ইউনিয়নের কয়েকজন লোক সাগর পথে মালেশিয়া যাওয়ার সময় নৌ ডুবির ঘটনা ঘটে যা আমরা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জেনেছি । তাদের সাথে বর্তমানে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। নিখোঁজ পরিবারের পক্ষ থেকে কোন অভিযোগ পাইনি। তবে এবিষয়ে প্রশাসনের উচ্চ পর্যায় ও গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি করে তথ্য অনুসন্ধান চলছে। পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এমদাদুল হক শরীফ বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।