প্রকাশ :: ... | ... | ...

লোভে পাপ,মোবাইল জুয়ায় সর্বনাশ! মোবাইলে ক্যাসিনোর থাবা: নিঃস্ব হচ্ছে বাঘাইছড়ির পাহাড়ি-বাঙালি যুব সমাজ,পঙ্গু হচ্ছে অর্থনীতি


সংযুক্ত ছবি

| ছবি: সংগৃহীত

কোটিপতি হওয়ার নেশায় এখন পুরো বাঘাইছড়ি ধ্বংসের পথে। হাতের মুঠোয় থাকা মোবাইল ফোনই আজ রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় হাজারো যুবক থেকে বৃদ্ধ সর্বনাশের কারণ। অনলাইন জুয়া ও ক্যাসিনো অ্যাপের সহজলভ্যতায় নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে পাহাড়ি-বাঙালি যুব সমাজ। পঙ্গু হয়ে পড়ছে এলাকার অর্থনীতি। আগে জুয়া খেলতে যেতে হতো আড়ালে-আবডালে। এখন আর তা লাগে না। ঘরে বসে, রাত জেগে মোবাইলের একটা ক্লিকেই চলছে কোটি টাকার জুয়া। বিদেশভিত্তিক বিভিন্ন চক্র বাংলাদেশের বাজারকে লক্ষ্য করে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তাদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দেশীয় এজেন্ট এবং মোবাইল আর্থিক সেবার কিছু অসাধু কর্মী। এসব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনলাইন জুয়ার অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে অনেক তরুণ-তরণী বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। সূত্রমতে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, বাঘাইছড়ির হাট বাজার থেকে শুরু করে প্রতিটি ইউনিয়ন, প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় এখন এই মরণ নেশা ঢুকে গেছে। ছাত্র থেকে ছাত্রী যুবক থেকে যুবতী চাকরিজীবী থেকে ব্যবসায়ী দিনমজুর থেকে শ্রমজীবী কেউই বাদ যাচ্ছে না এই মারাত্মক জুয়ার নেশা থেকে। বিভিন্ন পরিবার আজ নিঃস্ব, সর্বস্ব হারিয়ে এখন পথের ভিখারি কেউ কেউ গ্রাম ছাড়াও হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পাহাড়ি যুবক বলেন, প্রথমে ১ হাজার টাকায় ৮ হাজার জিতছিলাম। পরে লোভ সামলাতে পারি নাই। এরপর বাবার সেগুন বাগান বিক্রি করে ২ লাখ টাকা ঢুকাইছি খেলতে খেলতে সেগুলো হারাইছি। তারপরে সুদে এক লক্ষ টাকা নিলাম এগুলো হারাইলাম। সবশেষে এনজিও থেকে ৫০ হাজার টাকা লোন নিলাম। সব হারিয়ে এখন আমি ঘর ছাড়া হয়েছি। এক বৃদ্ধা বলেন, আমার ছেলে বিদেশ যাবে বলে ৩ লাখ টাকা জমাইছিলাম। সে টাকা মোবাইলে জুয়া খেলে শেষ, তারপর বিভিন্ন জনের থেকে ধার নিয়ে জুয়া খেলতো এখন আমার ছেলে একবারে নিঃস্ব হয়ে গেছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, দোকান বন্ধ করে মোবাইলে জুয়া খেলতাম। ভাবতাম এক রাতে কোটিপতি হমু। দোকানের ক্যাশের ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ছিল এগুলো সব হারাইছি। পরে দোকানের মাল বিক্রি করে করে মোবাইল জুয়া খেলে সব হারাইছি এখন দোকানও নাই, সব শেষে বাবার রেখে যাওয়া ৩০ শতক ধানের জমিন ছিল চার লক্ষ টাকা বিক্রি করে সেগুলো জুয়ায় শেষ করে এখন আমি দিনমজুরের কাজ করি। যারা এখনো মোবাইল জুয়ায় আসক্ত আমি বলবো আপনারা এই মরণ নেশা থেকে বেরিয়ে আসুন, না হলে আমার মত আপনাদেরও পরিণতি ভোগ করতে হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছু এক কলেজ পড়ুয়া ছাত্রী বলেন, আমার বান্ধবীরা মোবাইলে ক্যাসিনো খেলতে দেখতাম। প্রথমে ফেসবুকে এড দেখি। তারপর খেলা শুরু করি। টিউশনের টাকা, হাত খরচের টাকা বান্ধবী থেকে ধার নিয়ে মোবাইল জুয়ায় আসক্তি হয়ে পড়েছিলাম। পরে বাবা জানতে পেরে আমার মোবাইলটা ভেঙে ফেলে। এখন আব্বার কাছে টাকা চাইতে লজ্জা লাগে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অনলাইন জুয়ার কারণে পারিবারিক অশান্তি, বিচ্ছেদ, চুরি-ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ বাড়ছে এর থেকে একমাত্র বাঁচার উপায় প্রশাসন ও সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সুশীল সমাজের মতে, অনলাইন জুয়ার আসক্তি অনেক ক্ষেত্রে মাদকাসক্তির চেয়েও বেশি ক্ষতিকর হতে পারে। এটি মানুষের মস্তিষ্কের আনন্দকেন্দ্রকে প্রভাবিত করে। ফলে ক্ষতির পরও খেলোয়াড়ের মধ্যে অর্থ পুনরুদ্ধারের প্রবল আকাঙ্ক্ষা কাজ করে। কিন্তু বাস্তবে সেই চক্র থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত লাভবান হয় জুয়ার প্ল্যাটফর্মগুলোই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যারা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে অভ্যস্ত, তাদের মধ্যে অনলাইন জুয়ার প্রতি আগ্রহ বেশি দেখা যায়। জুয়ার সফটওয়্যারগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে খেলোয়াড় মাঝে মাঝে জয়ের স্বাদ পায়। এতে তার মধ্যে আগের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লাভবান হয় পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, ক্ষতিগ্রস্ত হয় খেলোয়াড়। বাঘাইছড়ি প্রেসক্লাবের সভাপতি আব্দুল মাবুদ বলেন, আমরা প্রতিদিন এমন খবর পাই। আজ একজন জমি বিক্রি করেছে, কাল একজন বউয়ের গহনা বিক্রি করেছে। মোবাইল জুয়া এখন আর গোপন কিছু নয়, এটা ওপেন সিক্রেট। এটি শুধু অপরাধ নয়, এটি একটি সামাজিক মহামারি। আমি প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানাই, এই জুয়ার এজেন্টদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হোক এবং প্রতিটি পৌরসভা ও ইউনিয়নে সচেতনতা সভা করা হোক। কাচালং সরকারি স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমি শুনেছি আমার অনেক ছাত্র, মোবাইল জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাই ভেঙে পড়বে। আমি একজন শিক্ষক হিসেবে প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করব, এই ভয়াল নেশা থেকে আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বাঁচান। একজন মানুষের অর্থনীতি ধ্বংস হলে একটি পরিবার ধ্বংস হয়। আর পরিবার ধ্বংস হলে দেশ ধ্বংস হতে সময় লাগে না। তাই এখনই প্রশাসন ও সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় বাঘাইছড়ির যুব সমাজকে আর বাঁচানো যাবে না।