| ছবি: মোহাম্মদ ইলিয়াছ
বান্দরবান জেলার দুর্গম থানচি উপজেলার তিন্দু ইউনিয়ন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও রোমাঞ্চকর পরিবেশের জন্য পর্যটকদের কাছে "বাংলাদেশের স্বর্গরাজ্য" হিসেবে পরিচিত। এই তিন্দুর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো সাঙ্গু নদী যার বুকে জেগে থাকা বিশাল বিশাল পাথরের মেলা। এই পাথরগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রহস্যময় ও ঐতিহ্যবাহী রাজা পাথর বা স্থানীয় মারমা ভাষায় বলা হয় বংডহ। রাজা পাথর যাওয়ার পথে দুই পাশে গগনচুম্বী সবুজ পাহাড় আর মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা সাঙ্গু নদীর স্ফটিক স্বচ্ছ নীল জলরাশি। বর্ষাকালে নদীটি প্রমত্তা ও বিপজ্জনক রূপ ধারণ করলেও শীত ও শুষ্ক মৌসুমে পানি কাঁচের মতো স্বচ্ছ হয়ে যায়। নদীর তলদেশের নুড়ি পাথরগুলো তখন উপর থেকেই স্পষ্ট দেখা যায়। নদীর মাঝখানে ছোট-বড় শত শত পাথর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে যার ঠিক মাঝখানে পাহাড়ের মতো মাথা উঁচু করে রাজকীয় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে রাজা পাথর। রাজা পাথর নাম করণের ইতিহাস: রাজা পাথরের নামকরণ নিয়ে স্থানীয় মারমা জনগোষ্ঠী মধ্যে প্রধানত দুটি উল্লেখযোগ্য জনশ্রুতি রয়েছে। সাধকের রাজমুকুট বা পাগড়ির গল্প: মারমা গবেষকদের মতে, মারমা শব্দ গবং যার অর্থ মুকুট বা পাগড়ি থেকে 'বংডহ' শব্দের উৎপত্তি হয়েছে যার সহজ অর্থ মুকুটধারী বড় পাথর বা পাথরের রাজা। কিংবদন্তি অনুযায়ী, বহু বছর আগে আরাকান (মিয়ানমার) থেকে কালাডাইন নদী পাড়ি দিয়ে এক পরম জ্ঞানী সাধক দিব্যজ্ঞান লাভ করে জানতে পারেন যে এই সাঙ্গু নদীতে বিপুল গুপ্তধন রয়েছে। তিনি গুপ্তধনের সন্ধানে এসে সাঙ্গুর বুকে এই বিশাল পাথরের ওপর ধ্যানমগ্ন হন। ধ্যান ও সন্ধান শেষে ফিরে যাওয়ার সময় তিনি ভুলবশত তাঁর রাজকীয় পাগড়িটি (মুকুট) ওই পাথরের চূড়াতেই ফেলে যান। মারমাদের বিশ্বাস, সেই সাধকের অলৌকিক মুকুটটিই কালক্রমে পাথরের মাথায় স্থায়ীভাবে বসে যায়। এই রাজমুকুটের মতো কাঠামোর কারণেই মারমারা একে বংডহ এবং সাধারণ পর্যটকেরা রাজা পাথর নামে ডাকেন। আরেকটি লোককথা অনুযায়ী, সুদূর অতীতে খরস্রোতা সাঙ্গুর এই পাথুরে অঞ্চলটি ছিল একটি সমৃদ্ধ রাজ্য। এক ভয়াল দিনে সাঙ্গুর প্রবল স্রোতে ওই রাজ্যের রাজকুমার ডুবে যান। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও যখন রাজপুত্রকে পাওয়া যায়নি, তখন পুত্রশোকে রাজা সাঙ্গুর তীরে স্তব্ধ হয়ে পাথরে পরিণত হন। রানীর অবস্থাও একই হয় এবং ধীরে ধীরে পুরো রাজ্যটাই পাথরে রূপ নেয়। নদীর বুকে সবচেয়ে বড় ও উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাথরটিকে সেই শোকাতুর রাজা হিসেবে মনে করা হয়। বর্তমানে স্থানীয় মারমা ও পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর কাছে এই রাজা পাথর অত্যন্ত পবিত্র এবং একটি জাগ্রত দেবতা। যুগ যুগ ধরে উপজাতিরা বিশ্বাস করেন, এই পাথরের এক অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে। এখনও মানুষ নিজের মনের আশা পূরণ, জুম চাষের ভালো ফলন বা ব্যবসায়িক সাফল্যের জন্য এই পাথরের কাছে মানত করেন। নৌপথে যাতায়াতের সময় স্থানীয় মাঝিরা এবং পাহাড়ী মানুষজন রাজা পাথরের প্রতি গভীর সম্মান প্রদর্শন করেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন, এই পাথরকে অসম্মান করলে বা নদীর এই অংশে অহংকার দেখালে রাজা ক্ষিপ্ত হবেন এবং নৌকাডুবি বা বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই অনেকেই এখানে রাজমুকুটের ওপর মোমবাতি জ্বালিয়ে পূজা ও প্রার্থনা করেন। যেভাবে রাজা পাথর এলাকায় যাওয়া যাবে: ঢাকা বান্দরবান হয়ে থানচি অথবা ঢাকা থেকে কক্সবাজারের চকরিয়া নেমে লামা-আলীকদম হয়ে থানচি বাজার আসতে হবে। পরে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় সাঙ্গু নদীর উজান বেয়ে প্রায় ১৯ কিলোমিটার (নৌকায় প্রায় ১.৫ থেকে ২ ঘণ্টা) এগোলেই তিন্দু ইউনিয়ন এবং তার কিছুটা সামনেই এই বিশাল পাথরের রাজ্য বা বড় পাথর এলাকা। থানচি থেকে তিন্দু হয়ে রেমাক্রি বা নাফাখুম জলপ্রপাতে যাওয়ার পথেই এই এলাকাটি পড়ে। নৌকা যখন বিশাল বিশাল পাথরের ফাঁক গলে প্রবল স্রোতের বিপরীতে ওপরে উঠতে থাকে, তখন এক দারুণ রোমাঞ্চকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। কোনো কোনো জায়গায় নদীর গভীরতা ও ঢাল এতটাই বেশি যে পর্যটকদের নৌকা থেকে নেমে হেঁটে পাথর পার হতে হয়, যা অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। থানচি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল বলেন, থানচি উপজেলায় বেশ কিছু পর্যটন স্পট রয়েছে যেখানে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পর্যটকরা ভ্রমনে আসে। তার মধ্যে তিন্দুর রাজা পাথর এলাকা অন্যতম। যেহেতু পর্যটন এলাকাগুলো পাহাড়ী ও ঝুকিপূর্ণ, তাই উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে গাইডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আমরা সব সময় চেস্টা করে আসছি পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমন নিশ্চিত করতে। আর তাছাড়াও সেনাবাহিনী ও বিজিবিরাতো কাজ করছেই।