| ছবি: মোহাম্মদ তৈয়্যবুল ইসলাম
বিশ বছর ধরে চরম অর্থকষ্ট আর পাহাড়সম সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিন সন্তানকে বুকে আগলে বড় করেছিলেন মা গুলতাজ বেগম। ভেবেছিলেন, সুদিন বুঝি এবার এলো। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই সুখের দেখা পাওয়ার আগেই স্তব্ধ হয়ে গেল একটি পরিবারের সব স্বপ্ন। নিখোঁজ হওয়ার চার দিন পর চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর দুর্গম পাহাড়ি এলাকার একটি লিচু বাগান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ওমান প্রবাসী মো. ওমর ফারুকের (২৫) হাত-পা বাঁধা মরদেহ। একদিকে বুকফাটা আর্তনাদে মূর্ছা যাচ্ছেন মা, অন্যদিকে স্বামীর ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছেন কয়েকদিন পরই সন্তানের জন্ম দিতে যাওয়া এক অন্তঃসত্ত্বা নারী। যে শিশুটি পৃথিবীর আলো দেখবে, সে আর কোনোদিন তার বাবাকে ডাকতে পারবে না—এই নির্মম সত্য যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না পরিবারটি। নিহত ওমর ফারুক চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া সরফভাটা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের মীরেরখীল এলাকার ওসমান আলীর মেজ ছেলে। প্রায় সাত বছর ওমানে প্রবাস জীবন কাটিয়ে দেড় বছর আগে তিনি দেশে ফেরেন এবং বিয়ে করে নতুন সংসার জীবন শুরু করেন। স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ২ জুন (মঙ্গলবার) বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর আর ফিরে আসেননি ফারুক। আত্মীয়-স্বজনসহ সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো হদিস মেলেনি। অবশেষে গত শনিবার (৬ জুন) সকালে বোয়ালখালীর জ্যৈষ্ঠপুরা এলাকার একটি পাহাড়ি লিচু বাগানে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় এক যুবকের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে পুলিশে খবর দেয় স্থানীয় বাসিন্দারা। পরে পরিবারের সদস্যরা গিয়ে ফারুকের মরদেহ শনাক্ত করেন। নিহত ফারুকের মা বুকফাটা কান্না জনিত কন্ঠে বলেন “আজ সুখের সময় কেন আমার বুকের মানিককে এভাবে হত্যা করা হলো! আমার ছেলের স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা, আর কয়েকদিন পরই সন্তান পৃথিবীর মুখ দেখবে। সেই শিশুটি তার বাবাকে কোথায় পাবে? মরদেহ উদ্ধারের স্থান ও আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়ে দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. হিলাল উদ্দিন আহমেদ জানান, যেহেতু মরদেহটি বোয়ালখালী থানা এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, তাই মূল মামলা এবং আইনি প্রক্রিয়া বোয়ালখালী থানাতেই সম্পন্ন হবে। ঘটনার সুষ্ঠু রহস্য উদ্ঘাটনে রাঙ্গুনিয়া থানা পুলিশ বোয়ালখালী পুলিশকে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করছে এবং একটি ছায়াতদন্ত চালাচ্ছে। এই নৃশংস ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো রাঙ্গুনিয়া ও বোয়ালখালী এলাকায় নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া। ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী। রেমিট্যান্স যোদ্ধা ফারুকের এমন করুণ পরিণতি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না কেউ। নিহত ফারুকের পরিবার ও এলাকাবাসীর এখন একটাই দাবি—অনতিবিলম্বে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পেছনের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করা হোক এবং জড়িত খুনিদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হোক।