প্রকাশ :: ... | ... | ...

বার্ধক্য,দারিদ্র্য ও অবহেলার নির্মম বাস্তবতা: রুমার প্রত্যন্ত পাহাড়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন মেসাংউ মার্মা


সংযুক্ত ছবি

| ছবি: অংবাচিং মারমা

বান্দরবানের রুমা উপজেলার ২নং সদর ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের ছাইপো পাড়ায় বসবাসকারী-৭১ বছর বয়সী মেসাংউ মার্মার জীবন আজ রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের এক কঠিন প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি একদিকে বার্ধক্যজনিত নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত,অন্যদিকে চরম দারিদ্র্য ও নিঃসঙ্গতার মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। একসময় স্বামী ও দুই কন্যা সন্তানকে নিয়ে ছোট্ট একটি সংসার ছিল তার। কিন্তু জন্মের পরপরই দুই কন্যা সন্তান মারা যায়। কয়েক বছর আগে স্বামীর মৃত্যুর পর সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েন তিনি। বর্তমানে তার পাশে দাঁড়ানোর মতো কোনো সন্তান কিংবা নিকট আত্মীয় নেই। ফলে জীবনের প্রতিটি দিন তাকে কাটাতে হচ্ছে অনিশ্চয়তা,অভাব এবং একাকীত্বের সঙ্গে লড়াই করে। সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়,একটি জরাজীর্ণ ছোট মাচাংঘরই এখন তার একমাত্র আশ্রয়স্থল। ঘরের ভেতরে নেই কোনো প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র বা জীবনযাপনের ন্যূনতম সুবিধা। কয়েকটি পুরোনো হাঁড়ি-পাতিল,দুটি কলসি এবং কিছু জীর্ণ কাপড়চোপড় ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। দুপুরের খাবারের জন্য সামান্য শাকসবজি রান্না করছিলেন তিনি। ভাতও ছিল অল্প পরিমাণে। এমন বাস্তবতা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়,প্রতিদিনই তাকে খাদ্য সংকটের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে মেসাংউ মার্মা বলেন,বয়সের কারণে এখন আর চোখে ভালোভাবে দেখতে পাই না। আগের মতো জুমচাষ বা বাগানের কাজও করতে পারি না। সরকারের দেওয়া বয়স্ক ভাতার টাকাই আমার একমাত্র ভরসা। কিন্তু সেই টাকাও নিয়মিত পাই না। তিন-চার মাস পরপর একসঙ্গে দেওয়া হয়। এই টাকায় বর্তমান বাজারে একজন মানুষের ন্যূনতম চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব নয়। তিনি আরও জানান,বয়সজনিত অসুস্থতার কারণে প্রতিদিনের স্বাভাবিক কাজকর্মও তার জন্য কষ্টকর হয়ে উঠেছে। চিকিৎসা,পুষ্টিকর খাদ্য কিংবা নিরাপদ বসবাসের মতো মৌলিক চাহিদাগুলোও তার নাগালের বাইরে। বর্তমানে তার সবচেয়ে বড় সহায় ছোট বোনের পরিবার। তারা নিজেদের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও মাঝে মাঝে চাল,শাকসবজি ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করেন। কিন্তু দূরত্ব ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সবসময় পাশে থাকা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। মেসাংউ মার্মার ভাগ্নি অংসাইওয়াং মার্মা, যিনি রুমা সরকারি সাঙ্গু কলেজের শিক্ষার্থী,বলেন, "আমার মাসি অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে জীবনযাপন করছেন। আমাদের পরিবার যতটুকু পারে সাহায্য করার চেষ্টা করে। কিন্তু আমাদের নিজেদেরও আর্থিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে তার সব প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব হয় না। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ,পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী অনেক প্রবীণ নাগরিক এখনও সরকারি ও সামাজিক সহায়তার যথাযথ আওতার বাইরে রয়ে গেছেন। বিশেষ করে নিঃসঙ্গ ও অসহায় প্রবীণদের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট। নিয়মিত ভাতা প্রদান,চিকিৎসাসেবা, নিরাপদ আবাসন এবং খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত না হওয়ায় তাদের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। সচেতন মহলের মতে,মেসাংউ মার্মার ঘটনা শুধু একজন বৃদ্ধার ব্যক্তিগত দুর্ভোগের গল্প নয়;এটি রুমা উপজেলা প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসরত অসংখ্য অসহায় প্রবীণের বাস্তব চিত্র। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও যদি একজন প্রবীণ নারী জীবনের শেষ বয়সে ন্যূনতম খাদ্য,চিকিৎসা ও নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত থাকেন,তাহলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয় হওয়া উচিত। এলাকাবাসী দ্রুত প্রশাসন,সমাজসেবা অধিদপ্তর, জনপ্রতিনিধি এবং বিত্তবানদের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের দাবি,মেসাংউ মার্মার জন্য নিয়মিত ভাতা,চিকিৎসাসেবা, খাদ্য সহায়তা ও একটি নিরাপদ বসবাসের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক, যাতে জীবনের শেষ সময়টুকু অন্তত মানবিক মর্যাদার সঙ্গে কাটাতে পারেন। মেসাংউ মার্মার নীরব কান্না আজ শুধু একটি পরিবারের নয়,বরং পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবহেলিত প্রবীণ জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অসহায়ত্বের প্রতিচ্ছবি। এখন দেখার বিষয়,এই আর্তনাদ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিবেককে কতটা নাড়া দেয়।