| ছবি: সংগ্রহীত
বান্দরবানে রুমা উপজেলার রুমা সদর ইউনিয়নের-৭ নং ওয়ার্ডের লেতংসে খুমী পাড়ায় গত ১৬ দিনের মধ্যে-৮ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় এলাকাজুড়ে উদ্বেগ ও শোকের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি,মৃত শিশুদের অধিকাংশের বয়স প্রায়-৫ থেকে-৬ বছর এবং তারা হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য বিভাগের তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। স্থানীয় সচেতন মহল ও পাড়াবাসীর অভিযোগ,প্রায় ৫–৬ বছর আগে সংশ্লিষ্ট এলাকায় দায়িত্বরত স্বাস্থ্য সহকারীর অবহেলার কারণে অনেক শিশু জন্মের পর নিয়মিত টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। তাদের ভাষ্য, যদি সে সময় নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী টিকাদান কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত হতো,তাহলে আজকের এই পরিস্থিতি হয়তো এড়ানো সম্ভব হতো। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক কর্মকর্তা জানান, প্রায় ৫–৬ বছর আগে বগালেক কেন্দ্রের আওতায় ওই এলাকায় আব্দুল মুশা নামে এক স্বাস্থ্য সহকারী দায়িত্ব পালন করতেন। তার দায়িত্ব পালন নিয়ে এলাকায় নানা অভিযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। গত-২৮ জুলাই হাসপাতালে গিয়ে দেখা মিলে বর্তমানে ওই এলাকার দায়িত্বে থাকা স্বাস্থ্য সহকারী সুস্মিটা তালুকদার বলেন,“আমি ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে চাকরিতে যোগদান করেছি। যোগদানের পর থেকে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করছি। বর্তমানে ২–৩ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে এ ধরনের সমস্যা দেখা যায়নি। যেসব শিশু মারা যাচ্ছে,তাদের অধিকাংশের বয়স ৫–৬ বছর। শুরুতে আমাকে শুধু পলি মৌজার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল,বর্তমানে রুমা মৌজা ও পলি মৌজা—দুটি মৌজার মোট ৩৯টি পাড়ায় আমাকে কাজ করতে হচ্ছে। একজন নারী স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে সীমাবদ্ধতা থাকলেও আমি সব এলাকায় পৌঁছানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আমার চাকরির বয়সও মাত্র আড়াই বছরের মতো। অন্যদিকে,স্বাস্থ্য সহকারী আব্দুল মুশা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি লেতংসে খুমী পাড়া ব্লকে মাত্র ১–২ বছর দায়িত্ব পালন করেছি এবং সেটিও প্রায় ১০ বছর আগে। বর্তমান ঘটনার সঙ্গে আমার দায়িত্বকালকে যুক্ত করা ঠিক হবে না। রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দায়িত্বরত কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুল্লাহ হাসান বলেন, “৪–৫ বছর আগে কোন এলাকায় কে দায়িত্বে ছিলেন, সে বিষয়ে আমার কাছে তথ্য নেই। বর্তমানে হাম-সংক্রান্ত পরিস্থিতির কারণে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য সহকারী সুসমিটা তালুকদারকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে রুমা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেন, “কাকে শোকজ করা হয়েছে,সে বিষয়ে আমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। তবে হামে আক্রান্ত কোনো রোগীর পরিবার যদি অর্থ বা যাতায়াতের অভাবে চিকিৎসা নিতে না পারে,তাহলে তারা আমাকে জানালে সরকারি সুযোগ-সুবিধার আওতায় সর্বোচ্চ সহযোগিতা করার চেষ্টা করব। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা ও টিকাদান কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরেই নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় অনেক পরিবার সময়মতো স্বাস্থ্যসেবা পায় না। ফলে প্রতিরোধযোগ্য রোগও কখনো কখনো প্রাণঘাতী রূপ নিচ্ছে। সচেতন মহলের মতে,একের পর এক শিশুমৃত্যুর ঘটনাকে কোনোভাবেই সাধারণ ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয়, টিকাদান কার্যক্রমে কোনো ধরনের গাফিলতি বা প্রশাসনিক ব্যর্থতা ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা এবং দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি তারা দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম জোরদার,পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। এখন এলাকাবাসীর একটাই প্রশ্ন—১৫ দিনের মধ্যে ৮টি শিশুর প্রাণহানির প্রকৃত কারণ কী? এটি কি শুধুই হামের প্রাদুর্ভাব,নাকি অতীতের টিকাদান কার্যক্রমে কোনো ঘাটতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব? এই প্রশ্নের নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য উত্তর দিতে দ্রুত, স্বচ্ছ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি দিন দিন জোরালো হয়ে উঠছে।