| ছবি: শুভ তালুকদার শান
দুপুরের তপ্ত কাঁচা রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা প্রকাণ্ড সেই গাছটার কথা মনে পড়ে? কিংবা বৈশাখ মাসের বিকেলের রোদ যখন হেলে পড়ত, তখন উঠানের কোণে ছায়া ফেলে রাখা নিমগাছটার নিচে বসে থাকা বয়োজ্যেষ্ঠদের কথা? গ্রামবাংলার প্রতিটি জনপদে, প্রতিটি পুরোনো বসতভিটার আঙিনায় নিমগাছ যেন কোনো অলিখিত নিয়মে নিজের স্থান করে নিয়েছিল।শৈশবের স্মৃতির পাতা উল্টালে নিমের তিতা স্বাদের এক অদ্ভূত অনুভূতি মনকে ছুঁয়ে যায়। সকালে ঘুম থেকে উঠে নিমের নরম কচি ডাল দিয়ে দাঁত মাজার সেই পুরোনো দৃশ্য আজ হয়তো শহরের ফ্ল্যাটবাড়ির প্লাস্টিক ব্রাশে রূপ বদলেছে, কিন্তু তার আবেগটুকু হারিয়ে যায়নি। শরীরে একটু ঘামাচি বা চুলকানি হলেই মায়ের বাণী "একটু নিমপাতা সিদ্ধ পানি দিয়ে গোসল কর, সব ঠিক হয়ে যাবে।" নিমের তিতা রস মুখে পড়া মাত্রই ছোটদের হাঁসফাঁস অবস্থা আর বড়দের প্রশান্তির হাসিই ছিল আমাদের ঘরোয়া সংস্কৃতির চিরচেনা রূপ। নিম কোনো সাধারণ গাছ নয়। বাংলার রূপ, রস ও মাটির সাথে এর সম্পর্ক বহু শতাব্দীর। আধুনিক নগরজীবনের ইট-কংক্রিটের ফাঁকে যখন আমরা অস্বস্তিবোধ করি, তখন গ্রামের রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা নিমগাছটি যেন লোকজ ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল হিসেবে ছায়া বিছিয়ে অপেক্ষা করে। বিজ্ঞানীরা একে ডাকেন Azadirachta indica নামে। এটি মেলিয়াসি (Meliaceae) পরিবারের একটি মেহগনি-জাতীয় বৃক্ষ। ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানসহ এই উপমহাদেশই নিমের আদি নিবাস। গাছটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর বিস্ময়কর টিকে থাকার ক্ষমতা। প্রকৃতি যখন রুক্ষ হয়ে ওঠে, অন্য গাছ যখন জলের অভাবে শুকিয়ে যেতে থাকে, নিমগাছ তখনও নিজের সবুজ অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখে নিজের গৌরবে। উষ্ণ ও শুষ্ক আবহাওয়া নিমের বাড়বাড়ন্তের জন্য একদম উপযুক্ত। বেলে দোআঁশ মাটি থেকে শুরু করে অনাবাদি বা পতিত জমিতেও নিমের শিকড় গভীরে প্রবেশ করে পুষ্টি টেনে নিতে পারে। তবে অতিরিক্ত জলাবদ্ধতা নিমগাছ সহ্য করতে পারে না। একটি পূর্ণবয়স্ক নিমগাছ সাধারণত ১৫ থেকে ২০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। এর বিস্তৃত ডালপালা চারপাশে বিশাল এক ছাতার মতো পরিবেশ তৈরি করে। বসন্তের শেষভাগে নিমের ডালে ছোট ছোট সাদা ফুল ফোটে, যার হালকা সুবাস চারপাশের বাতাসকে এক অন্যরকম স্নিগ্ধতায় ভরিয়ে দেয়। গ্রীষ্মে গাছে আসে ছোট ডিম্বাকৃতির নিমফল, যা পেকে গেলে হালকা হলদেটে রঙ ধারণ করে। নিমের এই সহিষ্ণু স্বভাবের কারণেই কোনো বাড়তি সার বা পরিচর্যা ছাড়াই এটি আমাদের গ্রামীণ জীবনের অংশ হয়ে উঠতে পেরেছে। আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি আসার আগেই এ দেশের মানুষ নিমের ঔষধি গুণ চিনেছিল। গ্রামীণ সমাজে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র পৌঁছানোর অনেক আগেই মানুষের প্রধান ভরসা ছিল লোকজ জ্ঞান। আর সেখানে নিমের ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয়। চর্মরোগ, এলার্জিতে নিমপাতা বেটে গায়ে মাখা কিংবা ফুটিয়ে সেই পানিতে গোসল করা গ্রামীণ বাংলার নিয়মিত অভ্যাস। টুথপেস্টের বহু আগে নিমের কচি ডাল ছিল মানুষের প্রধান দাঁতন, যা দাঁতের মাড়ি মজবুত করত। গৃহস্থ পরিবারে ধান, চাল বা ডাল দীর্ঘদিন হাঁড়িতে বা গোলায় রাখার সময় শুকনো নিমপাতা মিশিয়ে রাখা হতো, যাতে পোকা না ধরে। খালি পেটে নিমের কচি পাতার রস খেলে রক্তের দূষিত উপাদান দূর হয় এমন বিশ্বাসও প্রচলিত আছে। তবে লোকজ জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা রাখার পাশাপাশি আমাদের আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গিও ধারণ করতে হবে। প্রথাগত জ্ঞান অত্যন্ত মূল্যবান হলেও ‘প্রাকৃতিক মানেই সম্পূর্ণ নিরাপদ’ এই ধারণা সবসময় সঠিক নয়। নিমের শক্তিশালী বায়ো-অ্যাক্টিভ উপাদানের কারণে এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কখনো কখনো সংবেদনশীল ত্বকে প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী বা জটিল রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিমের নির্যাস বা গাঢ় তেল ব্যবহার না করাই বুদ্ধিমানের কাজ। আজকের বিশ্ব যখন বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক হুমকির মুখে, তখন নিমের মতো দেশীয় বৃক্ষের ভূমিকা নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে। শহরাঞ্চলের কথা একবার ভাবুন। পিচঢালা রাস্তা, উঁচু দালান আর অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে তৈরি হচ্ছে ‘হিট আইল্যান্ড’। শহরগুলো যেন একেকটি তপ্ত কড়াই। এমন পরিস্থিতিতে বৃক্ষ রোপণই পারে তাপমাত্রা কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে রাখতে। নিমের বিস্তৃত ডালপালা ও ঘন পাতার ছাউনি বাতাসের উষ্ণতা কমাতে অসাধারণ কাজ করে। একটি নিমগাছ শুধু একক কোনো বৃক্ষ নয়; এটি একটি পুরো বাস্তুতন্ত্র। একটি পরিণত নিমগাছকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় শত শত প্রাণীর জীবনচক্র। মেহগনি বা ইউক্যালিপটাসের মতো বিদেশি গাছের সংখ্যা যত বাড়ছে, আমাদের দেশীয় পাখিরা তত প্রাকৃতিক বাসস্থান হারাচ্ছে। সেখানে নিমগাছের শাখাপ্রশাখা শালিক, চড়ুই, বুলবুলি ও দোয়েল পাখির বাসা বাঁধার জন্য অত্যন্ত নিরাপদ। নিমের ফুল ও ফল অনেক পতঙ্গ, মৌমাছি ও ছোট পাখির খাদ্যের জোগান দেয়। বসন্তকালে নিমের ফুল ফুটলে মৌমাছিরা মধু সংগ্রহের জন্য ভিড় জমায়। এমনকি নিমের ঝরে পড়া পাতা যখন মাটিতে মিশে পচে যায়, তখন তা মাটির উপকারী অনুজীব ও কেঁচোর চমৎকার খাদ্য তৈরি করে, যা মাটির উর্বরতা বাড়ায়। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কৃত্রিম সৌন্দর্যবর্ধক গাছের চেয়ে নিমের মতো দেশীয় গাছের প্রয়োজনীয়তা তাই অপরিসীম। নিমগাছকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বিরাট পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব। আন্তর্জাতিক বাজারে আজ পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা তুঙ্গে। নিমকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশেই গড়ে উঠতে পারে বিশাল কুটির শিল্প। গ্রামের নারীদের সংগঠিত করে নিমবীজ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ করানো যেতে পারে। জ্যৈষ্ঠ মাসে নিমগাছ থেকে প্রচুর পাকা ফল ঝরে পড়ে। এগুলো কুড়িয়ে শুকিয়ে তা থেকে তেল নিষ্কাশনের ছোট ছোট উদ্যোগ তৈরি করা সম্ভব। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে নিম সাবান, ফেসওয়াস, বডি লোশন ও নিম টুথপেস্টের বিশাল চাহিদা রয়েছে। সঠিক মান নিয়ন্ত্রণ ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে এসব পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। বিশ্বব্যাপী অর্গানিক খাবারের চাহিদা বাড়ায় কৃষকদের নিমভিত্তিক সারে অভ্যস্ত করতে পারলে আমাদের উৎপাদিত ফসল বিশ্ববাজারে চড়া দামে বিক্রি করা যাবে। সম্ভাবনার এত উজ্জ্বল আলো থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে আমাদের চোখের সামনেই চারপাশের পুরোনো নিমগাছগুলো এক এক করে হারিয়ে যাচ্ছে। রাস্তা প্রশস্ত করা আর ভবন নির্মাণের নামে প্রতিদিন আমরা শত শত পুরোনো গাছ কেটে ফেলছি। একসময় যেসব মহাসড়কের দুপাশে বিশাল নিমগাছ পথচারীদের ছায়া দিত, সেখানে এখন শুধুই ধু ধু খাঁ খাঁ রোদ। আবার বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির নামে অনেক সময় হাজার হাজার চারা লাগানো হলেও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে তা টিকে থাকে না। নিমগাছ প্রকাণ্ড আকার ধারণ করে, অথচ অনেক সময় সরু ফুটপাতে বা ভবনের দেয়াল ঘেঁষে চারা লাগানো হয়। পরবর্তীতে গাছ বড় হলে দেয়াল ভেঙে যায় এবং বাধ্য হয়ে গাছ কেটে ফেলতে হয়। বিদ্যুতের লাইনের নিচে নিমগাছ লাগালে ডালপালা ছাঁটতে ছাঁটতে গাছটির আয়ু কমে যায়। চারা লাগিয়ে ছবি তুলে প্রচার চালানো হলেও পরবর্তীতে পরিচর্যার অভাবে রোদে শুকিয়ে চারা মারা যায়। যত্ন ও মনিটরিংয়ের অভাবে কোটি কোটি টাকার রোপণ প্রকল্প কোনো কাজে আসছে না। ভুল শুধরে নিমসহ অন্যান্য দেশীয় বৃক্ষ সংরক্ষণে এগিয়ে না এলে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সামলানো আমাদের জন্য কঠিন হবে। নিমের পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে হলে একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের খালি জায়গায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিমগাছ লাগানো দরকার। প্রতিটি শিক্ষার্থীকে যদি একটি করে নিম চারার দায়িত্ব দেওয়া হয়, তবে চারা বড় করার প্রক্রিয়ায় যুক্ত থেকে তারা প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল হতে শিখবে। পুকুরপাড়, খেলার মাঠের সীমানা, প্রশস্ত সড়কের দুপাশ ও পার্ক নিমগাছ লাগানোর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা। কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের নিমজাতীয় জৈব বালাইনাশকের ব্যবহার শেখাতে হবে। সেই সাথে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী গাছ কাটার ওপর কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা থাকা দরকার, যাতে হুট করে কেউ কাঠের প্রয়োজনে বা উন্নয়নের বাহানায় বড় গাছ কেটে ফেলতে না পারে। আমরা প্রায়ই একটি গাছকে মূল্যায়ন করি তার কাঠের দাম দিয়ে। কাঠ ব্যবসায়ী হয়তো একটি প্রকাণ্ড নিমগাছ দেখে বলবেন, "এটার দাম ৩০ হাজার টাকা।" কিন্তু এটি মারাত্মক ভুল দৃষ্টিভঙ্গি। একটি পূর্ণবয়স্ক নিমগাছ ৫০ বছর বেঁচে থাকলে পরিবেশকে কোটি টাকার সমপরিমাণ অক্সিজেন দেয়, বাতাস থেকে ক্ষতিকর গ্যাস শোষণ করে এবং মাটির ক্ষয় রোধ করে। তাহলে সামান্য কিছু টাকার কাঠের জন্য আমরা কি কোটি টাকার এই প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করব? দৃষ্টিভঙ্গির এই পরিবর্তনটিই আজ সবচেয়ে বেশি জরুরি। বাড়ির উঠানে বা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিমগাছটি কোনো দাবি নিয়ে দাঁড়িয়ে নেই। নিঃশব্দে সে আমাদের ছায়া দিয়ে চলেছে, কার্বন শুষে নিয়ে অক্সিজেন ফিরিয়ে দিচ্ছে, আর হাজারো অসুখ থেকে আগলে রাখছে। সে আসলেই প্রকৃতির এক নিঃস্বার্থ প্রহরী। আসুন, এই পুরোনো বন্ধুদের কেটে ফেলার আগে একটু ভাবি। অন্তত একটি নিমের চারা রোপণ করি এবং সেটিকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব নিই। কারণ এই প্রহরীদের বাঁচিয়ে রাখার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী। উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। রাস্তা চওড়া হবে, ভবন উঠবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই উন্নয়নের দাম যদি দিতে হয় চারপাশের সবুজ গাছ কেটে, তবে সেই উন্নয়ন একদিন অভিশাপ হয়েই ফিরে আসবে। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি আর তীব্র তাপপ্রবাহ আজ আমাদের সেই সতর্কবার্তাই দিচ্ছে।