প্রকাশ :: ... | ... | ...

বাবার দাবী,পূর্ব শত্রুতার জেরে ছেলেকে হত্যা গণপিটুনিতে মাদক কারবারি নিহত, গ্রেপ্তার এক


সংযুক্ত ছবি

| ছবি: দেলোয়ারের হোসেন রশিদী

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ইয়াবা বিক্রি ও সেবনের প্রতিবাদের জেরে মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দু'পক্ষের উত্তেজনা পরে গণপিটুনিতে মো. সেলিম (৪৫) নামে এক মাদক কারবারি নিহত হয়েছেন। এতে তার সহযোগী মো. মামুন (৩২) ও সৈয়দ হোসেন (৪০) আহত হয়েছেন। আহতদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। নিহত সেলিম একই ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাটাখালি এলাকার আবুল খায়েরের ছেলে। বৃহস্পতিবার (২৮ মে) রাতে উপজেলার চরতী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের খতিরহাট এলাকার সৈয়দের বাড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় নিহত মো. সেলিমের বাবা আবুল খায়ের বাদী হয়ে ২৯ জনের নাম উল্লেখ ও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে বৃহস্পতিবার মধ্য রাতে সাতকানিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পরপর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) জহির আমিন চরতির খতিরহাট এলাকায় অভিযান চালিয়ে মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ও ছৈয়দ হোসেনের ছেলে মো. ইসমাঈল প্রকাশ ইমনকে (২৮) গ্রেপ্তার করেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিহত সেলিম ২০১৮ সালে স্থানীয় আলমগীর নামের এক ব্যক্তিকে গুলি করেন। তিনি ওই মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ছিলেন। একই বছরের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ১৫ থেকে ২০ দিন আগে তিনি দুবাই চলে যান। হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের পাশাপাশি ইয়াবা ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেন। এ ছাড়াও তিনি চরতী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড খতিরহাট বাংলা বাজারের পদ্মা পুকুর পাড়ে সৈয়দ হোসেনের ভাড়া বাসায় থেকে দেদারসে ইয়াবা বিক্রি ও সেবন করতেন। তার ভাড়া বাসার সামনে রশিদ আহমদ নামে এক ব্যক্তির একটি স'মিল (করাতকল) রয়েছে। রশিদের ভাই নুরু সেটি দেখাশোনা করেন। প্রতিদিনই চলা ইয়াবার কারবার বন্ধে নুরু সেলিমকে বললেও সে (সেলিম) শুনেনি। উল্টো নুরু ঈদুল আযহার নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় সেলিম, পুতু, মামুন ও সৈয়দসহ আরও কয়েকজন মিলে তাকে মারধর করেন। খবর পেয়ে গদারঘোনা থেকে সরওয়ার নামে এক যুবক দূরদূরি সেন্টারে গিয়ে প্রতিবাদ করেন। পরে সেলিম ও তার সহযোগীরা মিলে সরওয়ারকে মারধর করে আটকে রাখেন। এ খবর গদারঘোনা এলাকায় পৌঁছালে মহিউদ্দিন ও ইমতিয়াজের নেতৃত্বে ৭ থেকে ৮ জন গণ্যমান্য লোক দূরদূরি সেন্টারে আসলে সেলিমের সঙ্গে তাদের বাকবিতন্ডা হয়। একপর্যায়ে সেলিম তাদেরকে ছুরি নিয়ে ধাওয়া দিলে তারা পালিয়ে যায়। এরপর গদারঘোনা থেকে দুই শতাধিক লোক দূরদূরি সেন্টারে এসে সরওয়ারকে উদ্ধারের পাশাপাশি সেলিমের সহযোগী মামুনকে তুলে নিয়ে যায়। বিষয়টি টের পেয়ে সেলিম, পুতু ও সৈয়দসহ আরও কয়েকজন পার্শ্ববর্তী পাহাড়ে পালিয়ে যায়। সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর তারা পুনরায় ভাড়া বাসায় এসে ইয়াবা সেবন শুরু করেন। খবর পাওয়ার সাথে সাথে গদারঘোনা থেকে তিন শতাধিক লোক এসে চোর-ডাকাত নেমেছে জানিয়ে বাসাটি ঘেরাও করে সেলিম ও তার দুই সহযোগীকে গণপিটুনি দেন। খবর পেয়ে থানা পুলিশের একটি টিম ঘটনাস্থল থেকে আহতদের উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেলিমের মৃত্যু হয়। শুক্রবার (২৯মে) চরতি দূরদূরি সেন্টার এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, এলাকায় নীরবতা বিরাজ করছে। সাংবাদিকরা ঘটনার বিষয়ে লোকজনকে জিজ্ঞাসা করলে কেউ এড়িয়ে যাচ্ছেন, কেউ কেউ দিচ্ছেন বিভ্রান্তিকর তথ্য। ঘটনা কি ঘটেছে , তাও বলতে নারাজ। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি কিছুটা জনসম্মুখের আড়ালে গিয়ে এ প্রতিবেদকে বলেন, সেলিমের মূলত এলাকায় ইয়াবার রাজত্ব তৈরি করা এবং এর প্রতিবাদ করলে লোকজনকে মারধর করায় এলাকার লোকজন আগে থেকেই ক্ষোভে ফুঁসছিল। এ ঘটনাটি এ ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ। নাম প্রকাশ না করে ছৈয়দ হোসেনের স্ত্রী দাবী করে এক মহিলা বলেন, সেলিম আমার স্বামীর কাছ থেকে ঘর ভাড়া নিয়েছিল ঠিক, তবে সে যে ইয়াবা ব্যবসা করছে কিনা তা আমরা জানি না। তিনি বলেন, ঘটনার সময় সেলিমসহ আরও কয়েকজনকে তার বাসা থেকে বের করে নিয়ে গিয়ে মারধর করে। সে সময় সেলিম ঘটনাস্থলে মারা যায়। অপরদিকে, নিহত সেলিমের বাড়িতে এ ঘটনা সম্পর্কে কথা বলতে গেলে তার স্বজনদের কাউকে বাড়িতে পাওয়া না যাওয়ায় কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে, সেলিমের বাবা বাদী হয়ে থানায় দায়েরকৃত এজাহারে উল্লেখ করেন, পূর্ব শত্রুতার জেরে সেলিমকে হত্যা করা হয়েছে। এদিকে, সাতকানিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) সুদীপ্ত রেজা জয়ন্ত এলাকায় ঘটনার পর থেকে পুনরায় সংঘাত ঠেকাতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে বলে দাবী করেন। তবে শুক্রবার সকালে সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে কোন পুলিশ সদস্যকে ঘটনাস্থল অথবা এলাকায় কোন টহল দিতে দেখা যায়নি। সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চোর সন্দেহে সেলিম নামে এক ব্যক্তিকে গণপিটুনি দিয়ে নিহত করা হয়। এ ঘটনায় এজাহারভুক্ত একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এক প্রশ্নে ওসি বলেন, প্রাথমিকভাবে সেলিমের বিরুদ্ধে থানায় একটি মারামারি মামলা পাওয়া গেছে। মাদকসহ অন্যান্য মামলা রয়েছে কিনা তা খুঁজে দেখা হবে।