প্রকাশ :: ... | ... | ...

রাতের আঁধারে আগর বাগান উজাড়, কর্তন করা ৩০টি গাছ জব্দ


সংযুক্ত ছবি

চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন পদুয়া রেঞ্জের বড়দুয়ারা বিট কাম চেক স্টেশনের মালিকানাধীন আগর বাগান উজাড় করে বন দখলের অভিযোগ উঠেছে হামিদ নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় কর্তন করা ৩০টি আগর গাছ জব্দ করেছে বন বিভাগ। শনিবার (২৫ এপ্রিল) সকাল ১১টার দিকে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার বাজালিয়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের হলুদিয়া বাজার সংলগ্ন বন বিভাগের আগর বাগান থেকে কর্তন করা গাছগুলো জব্দ করা হয়। জানা যায়, শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) রাত আনুমানিক ২টার দিকে হলুদিয়া বাজার সংলগ্ন বন বিভাগের আগর বাগান থেকে মো. হামিদ শ্রমিক দিয়ে গাছ কাটা শুরু করেন। আগর গাছগুলো কেটে বনের জায়গা দখল করে কলা চাষের পরিকল্পনা করেন তিনি। পরে খবর পেয়ে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অভিযান পরিচালনা করলেও ঘটনাস্থল থেকে সবাই সটকে পড়ায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। এরপর বন বিভাগ নিরুপায় হয়ে কর্তন করা প্রায় ৩০টি গাছের অন্তত ২ শতাধিক ছোট-বড় টুকরো জব্দ করেন। শনিবার (২৫ এপ্রিল) সকাল ১১টার দিকে জব্দকৃত আগর গাছগুলো উদ্ধার করে অফিসে নিয়ে আসেন। এর আগে হামিদের বিরুদ্ধে আরও দু'বার আগর গাছ কাটার অভিযোগ রয়েছে। সর্বশেষ চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেও তিনি আগর গাছ কর্তন করেছিলেন। আরও জানা যায়, শনিবার সকালে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্তন করা গাছগুলো উদ্ধারের জন্য গেলে অভিযুক্ত হামিদ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়াও তিনি বন বিভাগের লোকজনের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি প্রকাশ্যে ঘুরাঘুরি করলেও তাকে আটক করা হয়নি। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হামিদ নামে ওই ব্যক্তি আগর বাগানের বিশাল একটি অংশ দখল করে রেখেছেন। সেখানে তিনি সেমিপাকা বাড়ি নির্মাণ ও মুরগির খামার স্থাপনের পাশাপাশি কলা চাষ করেছেন। এবারও তিনি বনের জায়গা দখল করে কলা চাষের উদ্দেশ্যে প্রায় ৩০টি মূল্যবান আগর গাছ কেটে পাহাড়ের পাদদেশে লুকিয়ে রেখেছেন। কর্তন করা গাছগুলো যাতে সংশ্লিষ্টদের চোখে না পড়ে সেজন্য তিনি কলাপাতা ও আগাছা দিয়ে ঢেকে রেখেছিলেন। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এই অপরাধকে আরও উৎসাহিত করছে বলে মনে করছেন অনেকে। সরকারি গাছ কাটার ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে এসব আইনের প্রয়োগ না হওয়ায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। ফলে দিনের পর দিন দেদারসে সরকারি বনভূমি উজাড়ের পাশাপাশি পরিবেশের উপর ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগর গাছ একটি অত্যন্ত মূল্যবান ও পরিবেশবান্ধব বৃক্ষ। যা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অথচ সেই গাছ কেটে ফেলে স্বল্পমেয়াদি লাভের আশায় কলা চাষ করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা মো. সাইফুদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, দিনের পর দিন এভাবে সরকারি আগর গাছ কাটা হচ্ছে, অথচ কেউ যেন দেখেও দেখছে না। এর আগেও কয়েকবার আগর গাছ কাটা হলেও বন বিভাগ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। বন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কোথায়? তাদের নজরদারি কি শুধুমাত্র কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ? পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমার'র (ধরা) কার্যনির্বাহী সদস্য সানজিদা রহমান বলেন, আজ আগর গাছ কাটা হচ্ছে, কাল হয়তো পুরো বনই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এটি শুধু একটি স্থানীয় সমস্যা নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ের একটি বিপর্যয়। এখনই যদি কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এর ভয়াবহ ফল ভোগ করবে। আগর বাগান উজাড়ের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট স্টেশন কর্মকর্তা ও বনরক্ষীদের জবাবদিহির আওতায় আনলে এ অপরাধ পুরোপুরি রোধ হবে। আগর বাগান উজাড়ের ঘটনায় অভিযুক্ত হামিদ বলেন, আমি শ্রমিকদের কিছু ডাল-পালা কাটতে বলেছিলাম। কিন্তু তারা আমার অগোচরে গাছ কেটে ফেলেছে। বড়দুয়ারা বিট কাম চেক স্টেশন কর্মকর্তা ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, আগর গাছ কাটার খবর পেয়ে অভিযান চালিয়ে কর্তন করা গাছগুলো জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলা দায়ের করা হবে। পদুয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. রিয়াদুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, আমি ইতোমধ্যে ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছি। পুরো বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, আগর গাছ কাটার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট স্টেশন ও রেঞ্জ কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সোহেল রানা বলেন, আগর গাছ কাটার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।