| ছবি: সংগৃহীত
জনপ্রতিনিধি নির্বাচন শুধু ভোটের বাক্সে একটি প্রতীক বেছে নেওয়া নয়; এটি আগামী কয়েক বছরের জন্য নিজের এলাকার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সিদ্ধান্ত। স্থানীয় নির্বাচন সামনে। নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে স্বাভাবিকভাবেই প্রার্থীদের আনাগোনা বাড়বে, নানা প্রতিশ্রুতি শোনা যাবে, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও আবেগের কথাও সামনে আসবে। কিন্তু একজন সচেতন ভোটারের দায়িত্ব হলো—এসবের ঊর্ধ্বে উঠে প্রশ্ন করা, কে সত্যিকার অর্থে মানুষের জন্য কাজ করতে পারবেন? আমাদের ওয়ার্ড কিংবা ইউনিয়নের মানুষ এমন একজন জনপ্রতিনিধি চান, যিনি শুধু নির্বাচনের সময় মানুষের দরজায় যাবেন না; বরং নির্বাচনের পরও মানুষের পাশে থাকবেন। যার কাছে অসহায় মানুষ নিজের সমস্যার কথা বলতে পারবেন, অন্যায়ের শিকার মানুষ ন্যায়বিচারের আশায় যেতে পারবেন এবং একজন সাধারণ নাগরিক কোনো ভয়-ভীতি ছাড়াই তার অধিকার নিয়ে কথা বলতে পারবেন। মাদকমুক্ত সমাজ কি অসম্ভব? একটি এলাকার উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই এলাকার তরুণ সমাজ নিরাপদ থাকে। মাদক একটি পরিবারকে ধ্বংস করে, একটি তরুণের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে এবং ধীরে ধীরে পুরো সমাজকে দুর্বল করে দেয়। তাই জনপ্রতিনিধির অন্যতম বড় দায়িত্ব হওয়া উচিত মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ এবং তরুণ সমাজকে সঙ্গে নিয়ে মাদকবিরোধী কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। সালিশ-বিচারে চাই ন্যায়, প্রভাব নয় গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে মানুষের অনেক বিরোধ স্থানীয়ভাবে মীমাংসা হয়। সেখানে জনপ্রতিনিধির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সালিশ যেন কারও রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক অবস্থান কিংবা ব্যক্তিগত প্রভাবের কাছে পরাজিত না হয়। ধনী-গরিব, শক্তিশালী-দুর্বল, আপন-পর—সবার জন্য একই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত একজন জনপ্রতিনিধির নৈতিক দায়িত্ব। যে জনপ্রতিনিধি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেন না, তিনি জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধি হতে পারেন কি না—ভোট দেওয়ার আগে এই প্রশ্নটি প্রত্যেক ভোটারের করা উচিত। গরিব ও অসহায় মানুষের পাশে কে? একজন জনপ্রতিনিধির সফলতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে পারে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষের পাশে তার অবস্থান। যে বিধবা নারী, অসহায় পরিবার, দরিদ্র কৃষক, দিনমজুর কিংবা নির্যাতনের শিকার মানুষটি ক্ষমতাবান কারও বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পান—জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব হওয়া উচিত তার পাশে দাঁড়ানো। কারণ জনপ্রতিনিধির পদ কোনো ব্যক্তিগত ক্ষমতার আসন নয়; এটি জনগণের দেওয়া একটি আমানত ও দায়িত্ব। উন্নয়ন মানে শুধু রাস্তা-ঘাট নয় রাস্তা হবে, কালভার্ট হবে, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোর উন্নয়ন হবে—এসব অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু একটি ইউনিয়নকে সত্যিকার অর্থে উন্নত করতে হলে এর পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মানবিক মূল্যবোধের উন্নয়নও নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা, ঝরে পড়া শিক্ষার্থী কমানো, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়ানোর মতো উদ্যোগ একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। পাহাড়ি-বাঙালি সম্প্রীতি হোক উন্নয়নের ভিত্তি পার্বত্য এলাকার বাস্তবতায় সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক আস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে সব নাগরিকের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার মানসিকতা একজন জনপ্রতিনিধির মধ্যে থাকতে হবে। বিভাজন নয়, ঐক্য; সংঘাত নয়, সম্প্রীতি—এই নীতিতে এগিয়ে যেতে পারলে একটি ইউনিয়ন শুধু প্রশাসনিকভাবে নয়, সামাজিকভাবেও একটি মডেল ইউনিয়নে পরিণত হতে পারে। এবার সিদ্ধান্ত জনগণের নির্বাচনে কে কোন দলের, কার সঙ্গে কার সম্পর্ক, কে আত্মীয়, কে পরিচিত—এসব বিবেচনা থাকতেই পারে। কিন্তু শেষ সিদ্ধান্তটি হওয়া উচিত আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্নের ভিত্তিতে। কে সৎ? কে মানুষের কথা শোনেন? কে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবেন? কে মাদক ও অপরাধের বিরুদ্ধে কাজ করবেন? কে গরিব-অসহায়ের পাশে থাকবেন? কে শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করবেন? কে পাহাড়ি-বাঙালি সকল মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখতে পারবেন? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—কে নির্বাচনের পরও জনগণের কাছে জবাবদিহি করবেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে তারপর ভোট দেওয়া উচিত। কারণ একটি ভোট হয়তো মাত্র কয়েক সেকেন্ডে দেওয়া হয়, কিন্তু সেই ভোটের প্রভাব একটি এলাকার মানুষের জীবনে বছরের পর বছর থাকে। তাই আবেগ নয়, বিবেক দিয়ে সিদ্ধান্ত নিন। ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়, যোগ্যতাকে মূল্য দিন। প্রতিশ্রুতি নয়, অতীতের কাজ দেখুন। ক্ষমতার প্রদর্শন নয়, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা দেখুন। জনগণ যদি যোগ্য, সৎ, মানবিক ও জনবান্ধব নেতৃত্ব বেছে নেয়, তাহলে একটি ওয়ার্ড বদলাতে পারে, একটি ইউনিয়ন বদলাতে পারে—আর সেই পরিবর্তনের পথ ধরেই গড়ে উঠতে পারে একটি সুন্দর, নিরাপদ, মাদকমুক্ত ও উন্নত সমাজ। ভোট আপনার অধিকার। সঠিক নেতৃত্ব বেছে নেওয়া আপনার দায়িত্ব।