| ছবি: সংগ্রহীত
ঋণের বোঝা, সংসারের অভাব আর অনিশ্চিত জীবনের চাপ—এই তিনটি শব্দই যেন গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার দিনমজুর মন্টু মিয়ার জীবনকে ঘিরে রেখেছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, সেই অসহায়ত্বই হয়ে ওঠে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সবচেয়ে বড় পুঁজি। ১০ লাখ টাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে দেশ থেকে বিদেশে নেওয়া হয়। ফিরে আসেন একটি কিডনি হারিয়ে। কিন্তু প্রতিশ্রুত অর্থের বদলে পান মাত্র ৫০ হাজার টাকা। ঘটনাটি এখন আদালত ও পুলিশের তদন্তাধীন। তবে মামলার নথি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অভিযোগের ধরন একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে—বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষকে টার্গেট করে কি আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে আন্তঃদেশীয় মানবদেহের অঙ্গপাচার চক্র? গত ১৩ জুলাই মন্টু মিয়া জয়পুরহাট আদালতে মামলা করেন। মামলায় আটজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশে কালাই থানা মামলাটি এজাহার হিসেবে নথিভুক্ত করেছে। শনিবার (১ আগস্ট) কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। **অভাবের সুযোগ, কোটি টাকার প্রতিশ্রুতি** মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, এনজিও ও স্থানীয় ঋণের চাপে বিপর্যস্ত মন্টু মিয়ার সঙ্গে অভিযুক্তদের যোগাযোগ হয়। তাকে জানানো হয়, ঢাকার এক ধনী নারীর জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি কিডনি প্রয়োজন। বিনিময়ে দেওয়া হবে ১০ লাখ টাকা। দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট থেকে মুক্তির আশায় তিনি প্রস্তাবে রাজি হন। অভিযোগ অনুযায়ী, জানুয়ারির শুরুতে তাকে ঢাকায় এনে পাসপোর্ট তৈরি করে দেওয়া হয় এবং ৫০ হাজার টাকা অগ্রিম দেওয়া হয়। এরপর ভারত হয়ে নেপালের একটি হাসপাতালে নিয়ে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার একটি কিডনি অপসারণ করা হয়। কয়েক দিন চিকিৎসার পর দেশে ফিরিয়ে দেওয়া হলেও প্রতিশ্রুত বাকি অর্থ আর পরিশোধ করা হয়নি। **স্থানীয় সমাধান ব্যর্থ, আদালতের দ্বারস্থ** মন্টু মিয়ার দাবি, দেশে ফিরে বহুবার অভিযুক্তদের কাছে বাকি অর্থ দাবি করেও কোনো সাড়া পাননি। স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা ব্যর্থ হলে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হন। আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে থানাকে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। **শুধু প্রতারণা, নাকি বড় নেটওয়ার্ক?** মামলার বর্ণনায় যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে, সেগুলো তদন্তকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করছে। একজন দিনমজুরের পাসপোর্ট প্রস্তুত, সীমান্ত পেরিয়ে বিদেশে নেওয়া, বিদেশের হাসপাতালে অস্ত্রোপচার এবং দেশে ফিরিয়ে আনা—এসব ধাপ কোনো একক ব্যক্তির পক্ষে সম্পন্ন করা কঠিন। অভিযোগ সত্য হলে এর পেছনে দালাল, অর্থদাতা, সীমান্ত-সংযোগ এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত একাধিক পক্ষ জড়িত থাকতে পারে। তবে এসব বিষয়ে এখনো তদন্ত শেষ হয়নি। তাই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তদন্তের ফলই নির্ধারণ করবে অভিযোগের ভিত্তি কতটা শক্ত। **আইনজীবীর মত** জেলা জজ আদালতের আইনজীবী উজ্জ্বল হোসেন বলেন, অসহায় মানুষের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে মানবদেহের অঙ্গ নিয়ে অবৈধ বাণিজ্যের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত। **দারিদ্র্য যখন অপরাধচক্রের হাতিয়ার** এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দেয়, অর্থনৈতিক অসহায়ত্ব শুধু সামাজিক সমস্যা নয়; এটি সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের জন্যও একটি বড় সুযোগ। কর্মসংস্থানের সংকট, ঋণের চাপ এবং সামাজিক নিরাপত্তার ঘাটতি অনেক মানুষকে এমন ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়, যার পরিণতি সারাজীবন বহন করতে হয়। মন্টু মিয়ার অভিযোগ আদালতে কতটা প্রমাণিত হবে, সেটি বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—যদি অভিযোগের সত্যতা মিলেও থাকে, তবে এটি কেবল একজন দিনমজুরের কিডনি হারানোর ঘটনা নয়; বরং দারিদ্র্যকে পুঁজি করে মানবদেহের অঙ্গ নিয়ে অবৈধ বাণিজ্যের সম্ভাব্য নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের নজরদারি ও আইন প্রয়োগ কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে।