| ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে স্ক্র্যাপ জাহাজ এম টি রাসির ব্যালেস্টিক ট্যাংক কাটার সময় হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস বিষক্রিয়ায় ফেরদৌস শীপ ইয়ার্ডে ১০ শ্রমিকের মৃত্যু ঘটে। গ্যাস বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত শ্রমিকদের উদ্ধারকারী আরও ১৫ জন শ্রমিক গ্যাস বিষক্রিয়ায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। পরে নিহত শ্রমিককের পরিবার ক্ষতিপূরন বাবদ ১০ লাখ টাকা পেলেও শ্রম আইন অনুযায়ী কিছুই পায়নি আহত শ্রমিকরা। সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ আগস্ট ভাটিয়ারী সাগর উপকূলে অবস্থিত ফেরদৌস ষ্টিলে ব্যালেস্টিক ট্যাংকের হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের বিষক্রিয়ায় কর্মরত ৫ শ্রমিকের ঘটনাস্থলে মৃত্যু হয়। এ সময় আক্রান্ত শ্রমিকদের উদ্ধার করতে গিয়ে উদ্ধারকারী শ্রমিকরা হাসপাতালে চিকিৎসা পেয়ে বাড়ি ফিরে। কিন্তু চিকিৎসা শেষে আহতরা শ্রমিকরা বাড়ি ফিরলেও গ্যাসের বিষক্রিয়ামুক্ত হয়ে উঠেনি। এঅবস্থায় অসুস্থ শরীরে ঘর বন্ধি হয়ে মানবেতর জীবন পার করতে হচ্ছে বলে জানান আহত শ্রমিকরা। তারা বলেন,‘ আক্রান্ত শ্রমিকদের উদ্ধার করতে গিয়ে গ্যাস বিষক্রিয়ায় চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেলা হলেও চলাফেরা এখনও স্বাভাবিক হয়ে উঠছে না। বাড়ি ফিরে সম্পূর্ন বিশ্রামের পরামর্শ দিয়েছে ডাক্তার। গত ১৫ দিন ধরে বিনা চিকিৎসায় অর্থভাবে দিন পার করতে হচ্ছে। মৃত ব্যাক্তিদের পরিবারের মাঝে আর্থিক সহযোগীতা প্রদান করলেও আহতদেও খোঁজ নেয়নি। ঝুকিঁপূর্ন কাজ করিয়ে মজুরি প্রদান করেনি। উপাজর্ন বন্ধ থাকায় খাদ্যভাবে দিন পার করছেন দিপুসহ দৈনিক মজুরীর শ্রমিকরা। ইয়ার্ডের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার দিন ইয়ার্ডে ২৫ জন শ্রমিক কর্মরত ছিল। এরমধ্যে ৫ কাটারম্যান, ৩ জন কাটার হেলপার, ৪ জন পিল্টার, ৬ জন লোহারী, ১ জন শীপ ইনচার্জ, ১ জন শীপ কাটার ফোরম্যান, ১ জন সেফটি অফিসার, ১ জন ফিল্টার ফোরম্যান, ১ জন কাটার ফোরম্যান,১ জন সুপারভাইজার, ১ জন জেনারেল লেবার ওয়াইর, ১ জন কোয়ালিটি কন্ট্রোল ও ১ জন উইন্স অপেরেটর শীপের বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত ছিল। এ সময় গ্যাস বিষক্রিয়ায় বেলেস্টিক ট্যাংকে কর্মরত শ্রমিক, কর্মকর্তাসহ উদ্ধারকারী ২৫ জন শ্রমিকের মধ্যে ১০ জন মৃত্যু হয়েছে। তবে মৃত্যুর ঝুঁকি না থাকায় আহত শ্রমিকরা হাসপাতাল হতে বাড়ি ফিরেছে বলে জানান ফেরদৌস শীপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. ওভাইদুল্লা। তিনি বলেন,‘ নিহত ১০ শ্রমিকের পরিবারের মাঝে ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরন প্রদান করা হয়েছে। যথাযথ চিকিৎসা পেয়ে আহত শ্রমিকরা ঝুঁকিমুক্ত হয়ে বাড়ি ফিরেছে। আহত শ্রমিকদেও বেতন ও অন্যান্য সুবিধা দেয়ার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়নি। আহত শ্রমিকদের চিকিৎসা সেবাসহ পরিপূর্ন সুস্থ না হয়ে কাজে যোগদান না করা পর্যন্ত আর্থিক সহযোগীতা প্রদানে আইনে স্পষ্টত নির্দেশনা রয়েছে। অথচ শ্রম আইনে আহত শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা হলেও তা মানছে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে কল-কারখানা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সাহেদ পারভেজ বলেন,‘ আহত শ্রমিকদের চিকিৎসহ বেতন প্রদানে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ বাধ্য। এরপরও এতে কারসাজির আশ্রয় গ্রহন করলে কল-কারখানা আইনে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে বলে জানান তিনি। এ অবস্থায় ইয়ার্ড কার্যক্রম বন্ধ রেখে গ্যাস মজুদের ঘটনা তদন্তে নেমেছে বিশেভজ্ঞ দল। পরবর্তীতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে ইতিমধ্যে মারা যাওয়া শ্রমিকদের মৃত্যু তদন্ত কার্যক্রম চলাকালে শিপের ভেতর বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি থাকার আশংকায় তদন্তে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। গত দুই সপ্তাহের তদন্ত কার্যক্রমে গ্যাসের উপস্থিতির কারন অনুসন্ধান ও অপসারনে সিদ্ধান্ত আটকা পড়ে যায়। এক পর্যায়ে সব ধরনের প্রস্ততি নিয়ে শিল্প, পরিবেশ,বিস্পোরক ও জেলা প্রশাসনের তদন্তকারী বিশেষজ্ঞ দল জাহাজে প্রবেশ করে সব ধরনের বর্জের নমুনা সংগ্রহ শুরু করেছে। তবে তদন্ত চলাকালে পরিবেশ ছাড় পত্রের মেয়াদ উর্ত্তীন হওয়ার পরও শিপ কাটিং করায় ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষকে ৫ লাখ টাকার জরিমানা দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর পরিবেশ অধিদপ্তর। তাছাড়া ইয়ার্ডে ৯ জন শ্রমিকের মৃত্যুর চারদিন পর পুলিশ বাদী হয়ে একটি অপমৃত্যু মামলা করেছে। দুর্ঘটনায় নিহতদের সজনদের আর্তনাদে শোকার্ত হয়ে উঠে পুরো এলাকা। শিপ নিরাপদ না করে অর্থের বিনিময়ে ইয়ার্ড সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্রে জাহাজ কাটা চলতে থাকায় গ্যাসের বিষক্রিয়ায় শ্রমিকদের মৃত্যু হয়। ইয়ার্ডগুলো শিল্প আইন, পরিবেশ , ফায়ার ও বিস্পোরক আইন, শ্রম আইন লঙ্ঘন করায় ইয়ার্ডগুলোতে দুর্ঘটনা লেগে রয়েছে বলে অভিযোগ শ্রম অধিকার ও পরিবেশ আন্দোলনের। গ্রীন চট্টগ্রাম এলায়েন্সের সভাপতি জিয়াউর রহমান বলেন,‘ গ্রীন ইয়ার্ডে কার্বন মনোস্কাইড গ্যাস রেখে শীপ কাটার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো দায়ী। অর্থের বিনিময়ে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ, গ্যার্স ও বর্জ রেখে ছাড়পত্র প্রদান করা হয়। আর তা শ্রমিকরা অবগত না থাকায় গ্যাস লিকেজ কর্মরত শ্রমিকরা মৃত্যু বরন করে। শিপের বর্জ সমূদ্রে ফেলতে বন্ধের দিনে শ্রমিকদের কাজে লাগায়। দুর্ঘটনায় শ্রমিক নিহতের ঘটনায় ইয়ার্ড মালিকের পাশাপাশী ছাড়পত্র প্রদানকারী কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় আনার দাবী জানাচ্ছি। শ্রমিক নেতা মসিউদদৌলা বলেন,‘ শিপ ইয়ার্ডগুলোতে স্বল্প বেতনে শ্রমিকদের খাটানো হয়। শ্রমিকদের বিশ্রাম, পয়নিস্কাশনে ও চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। ছুটির দিন ও রাতের আধাঁরে বাধ্যগত কাজে লাগানো হয়। বন্ধের দিনে কাজ করিয়ে শ্রম আইন লঙ্ঘর করেছে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ। শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের বেতন প্রদান করতে হবে। নয়তো আন্দোলনের মাধ্যমে শ্রমিকদের ক্ষতিপূরন আদায় করা হবে। এদিকে, শিপে ক্ষতিকারক রাসায়নিকে উপস্থিতি প্রাথমিক পদার্থ না থাকার শিপটি নিরাপদ ধারনা তদন্তকারী দলের। তবে আরও দুটি ব্যালেস্টিক ট্যাংকে বিষাক্ত গ্যাসের শংকায় তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে। ট্যাংক দুটি হতে পানি বা ময়লা অপসারনের পর জাহাজ সম্পূর্ন নিরাপদ ঘোষিত হবে। কিন্তু নিরাপত্তজনিত কারন দেখিয়ে কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ক্ষতির মুখে পড়েছে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে বিস্পোরক কর্মকর্তা এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন,‘ তদন্ত শেষে না হওয়া পর্যন্ত শ্রমিকের মৃত্যুও কারন জানা যাচ্ছে না। ব্যালেস্টিক ট্যাংকে জমানো পানি রাখা হয়। সেই জমানো পানি গ্যাস হয়ে উঠার কারন অনুসন্ধান করছে বিশেষজ্ঞ দল। প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে জাহাজ কাটার অনুমতি দেয়া হবে। স্থানীয়দের অভিযোগ,‘ জাহাজের ভেতর বর্জ রয়েছে জানা সত্বে বন্ধের দিনে শ্রমিকদের কাজে লাগানো হয়েছে। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে বন্ধের দিনে বর্জগুলো সমুদ্রে ফেলতে ঝুকিপূর্ন অংশে শ্রমিকদের কাজে লাগায়। জাহাজে কাটার সাথে বিশাক্ত গ্যাস নির্গত হতে শ্রমিকরা লুটিয়ে পড়ে। ইয়ার্ডে নিজস্ব এম্বোলেন্স, ডাক্তার ও চিকিৎসক না থাকায় চিকিৎসা ব্যবস্থা ছাড়া আহত-নিহতদের দুই ঘন্টা ভেতরে আটকে রাখে। পরে জেলেরা আর্তনাদ শোনতে পাওয়ার পর শ্রমিকদের উদ্ধারে ইয়ার্ডে ঢুকে পড়ে এলাকাবাসী। দুর্ঘটনার পর আহত-নিহতের খোঁজে চট্টগ্রাম মেডিকেলে পৌছেন অর্থ মন্ত্রি। এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ১০ লাখ ক্ষতিপূরনের নির্দেশ প্রদান করে। এছাড়া স্থানীয় সাংসদ সদস্যসহ সরকারের উর্ধতন মহল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেও শীপ বের্কাস এসোসিয়েশনের কেউই উপস্থিত ছিলেন না। তবে ঘটনার পরদিন শিল্প মন্ত্রনালয়ের সচিবসহ পরিবশে,ফায়ার সার্ভিস, বিস্পোরক ও কল-কারখানার কর্তৃপক্ষের সঙে বিএসবিএর সভাপতি উপস্থিত ছিলেন। পরিদর্শকালে শিল্প সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষক দল থেকে দুর্ঘটনা ও শীপের অবস্থা সম্পর্কে নেন সচিব আবদুল খালেক নাছের খান। তিনি বলেন,‘স্ক্র্যাপ জাহাজে গ্যাসের উপস্থিতির কারন অনুসন্ধানে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ দল কাজ করছে। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য মতে বর্তমানে জাহাজে গ্যাসের কোনো উপস্থিতি নেই। জাহাজের ভেতর এল এনজি গ্যাসের মজুদকৃত ট্যাংকের তলিতে জমাট থাকা বর্জ অপসারন করা হবে। এক্ষেত্রে অপসারনকৃত বর্জে পরিবশে ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশংকা রয়েছে। পর্যবেক্ষন কাজে নিয়োজিত উপস্থিত ফায়ার সার্ভিসের উপ- পরিচালক বলেন,‘ গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া না গেলেও মজুদকৃত এল এন জির নিচের বর্জ অপসারনে ঝুঁকি রয়েছে। তারপর বিশেষ ব্যবস্থায় বর্জ ফেলে জাহাজটি পুরোপুরি ঝুকিমুক্ত করব।’ বিস্পোরন হওয়ার মতো কিছু না থাকায় অলস সময় কাটিয়ে চলে যান বিস্পোরক অধিদপ্তরের পরিদর্শক শওকত হোসেন ও কলকারখানার অধিদপ্তরের পরিদর্শক সাহেদ পারভেজ।