চোখের সামনেই চলছে জনস্বাস্থ্যের চরম ক্ষতি আর রাজস্ব ফাঁকির মহোৎসব, অথচ নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন! কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার রত্নাপালং ইউনিয়নে সম্পূর্ণ লাইসেন্সবিহীন ও নোংরা পরিবেশে "পিউরেক্স" নামক কথিত এক কারখানায় তৈরি হচ্ছে বেকারি পণ্য। জালিয়াতির চরম সীমায় পৌঁছে পণ্যের মোড়কে ব্যবহার করা হচ্ছে সরকারের "বিএসটিআই" অনুমোদনের ভুয়া সিল ও লোগো। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই প্রকাশ্য জালিয়াতি ও অবৈধ বাণিজ্যের অকাট্য তথ্য-প্রমাণ ও ছবিসহ উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সরকারি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে যোগাযোগ করা হলেও গত তিন দিনেও ঘুম ভাঙেনি প্রশাসনের; মেলেনি কোনো সাড়াও!
একটি সিন্ডিকেট সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেললেও প্রশাসন নীরব। অথচ দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী এই কারখানার প্রতিটি কর্মকাণ্ড মারাত্মক ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন- ২০০৯ এই আইনের ৪৪ ও ৫০ ধারায় বলা আছে লাইসেন্স ছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য তৈরি করা এবং পণ্যের মোড়কে মিথ্যা তথ্য ও ভুয়া বিএসটিআই সিল ব্যবহার করা চরম দণ্ডনীয় অপরাধ। এর শাস্তি হিসেবে বিশাল অঙ্কের জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
নিরাপদ খাদ্য আইন- ২০১৩ এই আইনের ২৩ ও ২৪ ধারায় উল্লেখ আছে কোনো প্রকার গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কেমিক্যাল ব্যবহার করে খাদ্যপণ্য উৎপাদন করা এই আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। এছাড়া ২৬ ও ৫৮ ধারা অনুযায়ী খাদ্যে ক্ষতিকর কেমিক্যাল বা বিষাক্ত উপাদান ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, যার শাস্তি হিসেবে অনূর্ধ্ব ৫ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান আছে।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) আইন- ২০১৮ এই আইনের ১৫ ও ২৭ ধারা অনুযায়ী বিএসটিআই'র লাইসেন্স ছাড়া লোগো ব্যবহার বা ভুয়া সার্টিফিকেশন দাবি করা আমলযোগ্য অপরাধ, যার শাস্তি হিসেবে অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ডের স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে।
বিদ্যুৎ আইন-২০১৮ এই আইনের ৩০ ধারা অনুযায়ী আবাসিক সংযোগের বিদ্যুৎ বাণিজ্যিক বা শিল্প কারখানায় ব্যবহার করা অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহার ও চুরির শামিল। এটি বিদ্যুৎ ব্যবহারের শর্তাবলীর চরম লঙ্ঘন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কোর্টবাজার ২নং রত্নাপালং ইউনিয়ন পরিষদের ৯নং ওয়ার্ডের মধ্যরত্নাপালং স্কুল সড়কের মাথায় "রায়হানের বাসা" নামে একটি ভবন ভাড়া নিয়ে গোপনে এই সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন ‘তারেক’ নামের এক বহিরাগত ব্যক্তি। নিজের স্থায়ী পরিচয় নিয়ে ধোঁয়াশা রাখা এই ব্যক্তি কোনো প্রকার ট্রেড লাইসেন্স বা পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই একটি সাধারণ অন্ধকার কক্ষে নোংরা পরিবেশে কেক ও বন তৈরি করছেন।
চকচকে মোড়কে ভুয়া বিএসটিআই সিল মেরে উখিয়া উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার ও বিশেষ করে স্কুলের সামনের দোকানগুলোতে এসব পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে অবুঝ শিশু ও শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন এই বিষাক্ত ও ভেজাল খাবার কিনে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে।
কোনো ধরনের ভ্যাট, ট্যাক্স বা সরকারি ফি না দিয়ে এই অবৈধ ব্যবসা পরিচালনার কারণে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। তার ওপর কমার্শিয়াল বা বাণিজ্যিক মিটার না নিয়ে আবাসিক লাইনের বিদ্যুৎ দিয়ে কারখানা চালানোয় সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগও বড় লোকসানের মুখে পড়ছে। এ বিষয়ে অভিযুক্ত তারেকের মুঠোফোনে বারবার চেষ্টা করা হলেও তিনি সাংবাদিকদের কোনো সদুত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যান।
স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন, যেখানে সরকারের উচ্চ পর্যায় ভেজাল খাদ্য ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছে, সেখানে উখিয়া উপজেলা প্রশাসনের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ দেওয়ার পরও কেন দ্রুত অভিযান চালানো হলো না?
তবে এ বিষয়ে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার জানান, "এ ব্যাপারটি আমার সহকারী কমিশনার (ভূমি), উখিয়াকে জানানো হয়েছে। তিনি খুব শীঘ্রই এই অবৈধ কারখানার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করবেন।"
প্রশাসনের এই আশ্বাসের পর জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক হুমকি মোকাবিলায় অনতিবিলম্বে উখিয়া উপজেলা প্রশাসন, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে এই অবৈধ ‘পিউরেক্স’ কারখানায় ঝটিকা অভিযান চালিয়ে সিলগালা করার জোর দাবি জানিয়েছে উখিয়াবাসী।