শিরোনামঃ

মাতারবাড়ীতে ১ বিলিয়ন ডলারের ‘সবুজ ডকইয়ার্ড’ নির্মাণে চূড়ান্ত অনুমোদন

গভীর সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে পরিবেশবান্ধব জাহাজ মেরামত ও নির্মাণ কেন্দ্র; সরকারি জমির মালিকানা অক্ষুণ্ণ রেখে পিপিপি মডেলে বাস্তবায়ন, সৃষ্টি হবে হাজারো কর্মসংস্থান

মামুনুর রশিদ
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে দেশের প্রথম পরিবেশবান্ধব ‘সবুজ ডকইয়ার্ড ও জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্র’ স্থাপনের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কার্যকারিতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মানের জাহাজ মেরামত সুবিধা নিশ্চিত করা, ব্লু-ইকোনমির বিকাশ এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের লক্ষ্যে নেওয়া এই মেগা প্রকল্পটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) আওতায় বাস্তবায়িত হবে।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রকল্পটির নীতিগত অনুমোদনের পর দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এর অনাকাঙ্ক্ষিত প্রস্তাব (আনসোলিসিটেড প্রপোজাল) মূল্যায়নের জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন শেষে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপ শুরু হবে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সম্পূর্ণ ‘ল্যান্ডলর্ড মডেল’ অনুসরণ করা হবে। এতে প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত প্রায় ২০০ একর জমির শতভাগ মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে। বেসরকারি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচালনা করলেও চুক্তির মেয়াদ শেষে সব স্থাপনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাষ্ট্রের মালিকানায় হস্তান্তর হবে। ফলে সরকারের কোনো ঋণঝুঁকি বা জমির মালিকানা হারানোর আশঙ্কা থাকবে না।

প্রকল্পটির প্রধান বিনিয়োগকারী হিসেবে কাজ করছে অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এআইএস মেরিন ইনভেস্টমেন্টস পিটিওয়াই লিমিটেড।

প্রশাসনিক জটিলতা কাটল

ডকইয়ার্ড শিল্প সাধারণত শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত হলেও প্রকল্পটির কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় গত ৭ জুন অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় শিল্প মন্ত্রণালয় এতে অনাপত্তি (এনওসি) দেয়। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতার অবসান ঘটিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ সুগম হয়।

গভীর সমুদ্রবন্দরের জন্য কৌশলগত সুবিধা

মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে সেখানে বড় আকারের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করবে। এসব জাহাজের বাধ্যতামূলক ডকিং ও জরুরি মেরামতের জন্য আধুনিক সুবিধা নিশ্চিত করতেই এই ডকইয়ার্ড নির্মাণ করা হচ্ছে।

প্রকল্পে ৬০০ মিটার দীর্ঘ ও ৯৫ মিটার প্রশস্ত একটি অত্যাধুনিক ড্রাই ডক নির্মাণ করা হবে, যেখানে বিশ্বের বড় আকারের সমুদ্রগামী জাহাজও সহজেই মেরামত করা সম্ভব হবে। বর্তমানে এ ধরনের জাহাজ মেরামতের জন্য সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা চীনের বন্দরে যেতে হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ নিজেই আঞ্চলিক সামুদ্রিক সেবা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে।

এতে বন্দরের নৌপথে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ দ্রুত মেরামত করা সম্ভব হবে। ফলে বন্দর চ্যানেল সচল থাকবে, অপারেশনাল বিঘ্ন কমবে এবং জাহাজ মালিক ও আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানির সময় ও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে সাশ্রয় হবে।

পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার

দেশের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ‘সবুজ ডকইয়ার্ড’ হিসেবে প্রকল্পটিতে পরিবেশ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার ‘নেট জিরো’ কাঠামো, ‘গ্রিন ভয়েজ ২০৫০’ উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক মান সংস্থার পরিবেশগত মানদণ্ড অনুসরণ করে কম কার্বন নির্গমনকারী জ্বালানি ব্যবস্থা, বদ্ধচক্র বর্জ্য পানি শোধন প্রযুক্তি এবং বিপজ্জনক রাসায়নিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।

এছাড়া প্রকল্পটি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) শিল্প ও অবকাঠামো, শোভন কর্মসংস্থান, জলজ জীবন সংরক্ষণ এবং জলবায়ু কার্যক্রম—এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জনে ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে তিন হাজারের বেশি কর্মসংস্থান হবে।যেমন,প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরাসরি প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ জন প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ ও দক্ষ কারিগরের কর্মসংস্থান হবে। পাশাপাশি আরও প্রায় ২ হাজার ৬০০ মানুষের পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

এর পাশাপাশি স্থানীয় প্রকৌশল শিল্প, ইস্পাত উৎপাদন, জাহাজ সরঞ্জাম সরবরাহ, লজিস্টিকস এবং সামুদ্রিক সাপ্লাই চেইনভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পেরও ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটবে।

নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডও পাবে সুবিধা

এই ডকইয়ার্ডে শুধু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজই নয়, বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের জাহাজও বিশ্বমানের মেরামত সুবিধা পাবে। এতে দেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রকল্পটি সম্পূর্ণ বেসরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িত হবে। সরকারের কোনো ঋণ নিতে হবে না। বর্তমানে পিপিপি কর্তৃপক্ষের অধীনে প্রকল্পটির কারিগরি, আর্থিক ও বিনিয়োগ মূল্যায়নের কাজ এগিয়ে চলছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বাস্তবায়ন হলে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে গড়ে ওঠা শিল্পাঞ্চল, জ্বালানি কেন্দ্র এবং বন্দর-লজিস্টিকস হাবের অন্যতম সহায়ক অবকাঠামো হবে এই সবুজ ডকইয়ার্ড। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের ব্লু-ইকোনমি, জাহাজ শিল্প এবং সামুদ্রিক অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বিষয়:

এলাকার খবর

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL