শিরোনামঃ

চট্টগ্রাম বিআরটিএতে শফিকুজ্জামান ভূঞার যোগদান

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এর নির্দেশে শফিকুজ্জামান ভূঞাকে ‘বিএনপি-ঘনিষ্ঠ’ বা ‘বিএনপি ট্যাগ’ দিয়ে প্রশাসনিক চাপের মুখে চট্টগ্রাম থেকে রাজশাহী শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছিল।

মামুনুর রশিদ
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিআরটিএ কার্যালয়ে  মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) নতুন পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) হিসেবে যোগদান করেন শফিকুজ্জামান ভূঞা। দীর্ঘদিন চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালন করা পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. মাসুদ আলমের বদলির পর তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন তিনি।
ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ে একই পদে দায়িত্ব পালন করা শফিকুজ্জামান ভূঞার চট্টগ্রামে পদায়নকে ঘিরে বিআরটিএ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, পরিবহন ব্যবসায়ী, চালক-মালিক ও সেবাপ্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
নতুন পরিচালকের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম বিআরটিএকে ঘিরে ওঠা দালালচক্র, অনিয়ম, হয়রানি ও কথিত প্রভাববলয়ের অভিযোগে তিনি কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারবেন? নাকি পরিচালক বদল হলেও আগের ব্যবস্থাই নতুন কাঠামোয় বহাল থাকবে?
বিআরটিএ চেয়ারম্যানের কার্যালয় থেকে গত ৩১ আগস্ট জারি করা অফিস আদেশে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. মাসুদ আলমকে ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ে একই পদে বদলি করা হয়। একই আদেশে ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) শফিকুজ্জামান ভূঞাকে চট্টগ্রামে পদায়ন করা হয়।
এর মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম বিআরটিএর গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে দায়িত্বে পরিবর্তন আসে। দীর্ঘদিন চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালন করা মাসুদ আলমের জায়গায় এখন দায়িত্ব নিয়েছেন শফিকুজ্জামান ভূঞা।
মো. মাসুদ আলম বিআরটিএ কর্মকর্তা হিসেবে বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছেন। বিআরটিএর সেবা ও অনিয়ম নিয়ে এক পরিদর্শনের সময় তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের তাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, ‘তুমি এখনও ভালো হওনি, ভালো হয়ে যাও মাসুদ।’ ওই বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে আলোচনায় আসেন তিনি।
সাম্প্রতিক সময়েও তার বদলি নিয়ে নানা আলোচনা ছিল। এর আগে জুলাইয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, তাকে চট্টগ্রাম থেকে সরানোর একটি পূর্ববর্তী আদেশ কার্যকর হয়নি এবং পরবর্তী সময়ে সেটি বাতিল হয়ে যায়। তবে এবার ৩১ আগস্টের অফিস আদেশে তার বদলি কার্যকরের সিদ্ধান্ত স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিআরটিএকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন মহলে একটি ‘অদৃশ্য প্রভাববলয়’ কিংবা ‘সিন্ডিকেট’ থাকার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সরকার পরিবর্তন হলেও কার্যালয়ের অভ্যন্তরে কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী, বাইরে সক্রিয় দালালচক্র এবং পরিবহন খাতের কিছু ব্যক্তির প্রভাব পুরোপুরি দূর হয়নি।
নতুন পরিচালক শফিকুজ্জামান ভূঞার বলেন, বিআরটিএ কার্যালয়ের ভেতর-বাইরের কথিত প্রভাববলয় নিয়ে নিরপেক্ষভাবে খোঁজ নেওয়া হবে এবং অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট মহলের একটি অংশের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এর  নির্দেশে শফিকুজ্জামান ভূঞাকে ‘বিএনপি-ঘনিষ্ঠ’ বা ‘বিএনপি ট্যাগ’ দিয়ে প্রশাসনিক চাপের মুখে চট্টগ্রাম থেকে রাজশাহী শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছিল।ওই বদলী ঘিরে জড়িত ছিলো বিআরটিএ ভিতরে বাইরে একটি সিন্ডিকেট।সেই সিন্ডিকেটের প্রধান সেনাপতি বীরদর্পে বহাল তবিয়তে এখনো আছেন বিআরটিএ'তে।
শফিকুজ্জামান ভূঞাকে আবার চট্টগ্রাম বিআরটিএর পরিচালক হিসেবে ফিরছেন। ফলে তার অতীতের বদলি ও বর্তমান পদায়ন নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিআরটিএ কার্যালয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ বিভিন্ন সেবা নিতে আসেন। ড্রাইভিং লাইসেন্স, শিক্ষানবিশ লাইসেন্স, ফিটনেস সনদ, গাড়ির নিবন্ধন, মালিকানা পরিবর্তন, ট্যাক্স টোকেনসহ বিভিন্ন সেবার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত সাধারণ মানুষ।
সেবাপ্রত্যাশীদের অভিযোগের বড় অংশজুড়ে থাকে—দীর্ঘসূত্রতা, হয়রানি, দালালের দৌরাত্ম্য এবং নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দাবির অভিযোগ।
নতুন পরিচালকের জন্য তাই শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনই যথেষ্ট নয়; সেবাগ্রহীতার অভিজ্ঞতা বদলানোই হবে তার কার্যকারিতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
বিআরটিএ কার্যালয়ের বাইরে দালালদের উপস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। অনেক সেবাপ্রত্যাশী প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পর্কে না জানায় দালালের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। আর এই সুযোগেই একটি অংশ অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দালালনির্ভরতা কমাতে হলে শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না। অনলাইন সেবা আরও কার্যকর করা, প্রতিটি সেবার নির্ধারিত ফি দৃশ্যমানভাবে প্রচার, আবেদন ও ফাইলের অগ্রগতি অনলাইনে দেখার সুযোগ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
শফিকুজ্জামান ভূঞার দায়িত্ব গ্রহণের পর সংশ্লিষ্ট মহল অন্তত পাঁচটি বিষয়ে তার তাৎক্ষণিক নজর প্রত্যাশা করছে—এক. বিআরটিএ কার্যালয়কে দালালমুক্ত করার কার্যকর উদ্যোগ।দুই. সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের হয়রানি ও অযথা অপেক্ষা বন্ধ করা।তিন. অতিরিক্ত অর্থ আদায় বা অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।চার. কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।পাঁচ. কার্যালয়ের ভেতর-বাইরে কোনো প্রভাববলয় বা অনৈতিক যোগসূত্র থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে চিহ্নিত করা।
চট্টগ্রাম বিআরটিএর ইতিহাসে পরিচালক বদলি নতুন কোনো ঘটনা নয়। এক কর্মকর্তা বদলি হন, নতুন কর্মকর্তা দায়িত্ব নেন; কিন্তু সেবাপ্রত্যাশী মানুষের অভিজ্ঞতা যদি একই থাকে, তাহলে প্রশাসনিক পরিবর্তনের সুফল কতটা পাওয়া গেল—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
চট্টগ্রামের পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, টেকসই পরিবর্তনের জন্য শুধু পরিচালক পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সেবাব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার, ডিজিটাল নজরদারি, অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা।
শফিকুজ্জামান ভূঞার যোগদান তাই নিছক একটি প্রশাসনিক বদলি নয়; এটি চট্টগ্রাম বিআরটিএর দীর্ঘদিনের বিতর্কিত বিষয়গুলো নতুন করে পর্যালোচনার একটি সুযোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
তার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহেই অনেকটা পরিষ্কার হবে—তিনি প্রচলিত ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে চলবেন, নাকি দীর্ঘদিনের অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে দৃশ্যমান পরিবর্তনের উদ্যোগ নেবেন।
তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি প্রথমে কার সঙ্গে বৈঠক করেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কী নির্দেশনা দেন, দালালচক্র নিয়ে কী অবস্থান নেন এবং সাধারণ মানুষের সেবা নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ ঘোষণা করেন—এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্ট সবার।

বিষয়:

এলাকার খবর

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL