একটি ভাষার মৃত্যুঘণ্টা বেজে ওঠে তখনই, যখন সেই ভাষায় কথা বলতে পারেন এমন মানুষের সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকজনে নেমে আসে। বাংলাদেশের পার্বত্যাঞ্চলের বিলুপ্তপ্রায় রেংমিৎচা ভাষা এখন ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে দাঁড়িয়ে।
অল্প কিছুদিন আগেও এই ভাষায় কথা বলতে পারতেন মাত্র ছয়জন মানুষ। চলতি বছরের ৫ মে তাঁদের একজন, নাইক্ষ্যংছড়ির সাং প্লইং এলাকার মাংওয়াই ম্রো (৬৪) মারা যাওয়ার পর জীবিত ভাষাভাষীর সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র পাঁচজনে। বর্তমানে ভাষাটির প্রধান জীবন্ত ধারক রয়েছেন তাঁর দুই বড় ভাই—মাংপুং ম্রো (৭৪) ও রেংপুং ম্রো (৭০)। দীর্ঘদিন ধরে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন দু’জনই। ফলে ভাষাটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আয়ারল্যান্ডের ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনে ‘রেংমিটচা ভাষার নথিভুক্তকরণ: বাংলাদেশের একটি অতি বিপন্ন ভাষা’ নিয়ে পিএইচডি গবেষক আফসানা ফেরদৌস জানান, আলীকদম উপজেলার তৈনখালের ক্রাংসি পাড়ার কয়েকজন ম্রো বাসিন্দা সম্প্রতি তাঁকে মাংওয়াই ম্রোর মৃত্যুর খবর জানান। তাঁর ভাষায়, ভাষাটির অস্তিত্ব এখন সময়ের বিরুদ্ধে এক কঠিন লড়াই।
রেংমিৎচা ভাষা আংশিক বলতে পারেন এমন প্রবীণ রেংপুং ম্রো হেডম্যান বলেন, “নতুন প্রজন্মের আর কেউ মাতৃভাষা ধারণ করতে আগ্রহী নয়। এভাবে রেংমিৎচা ভাষা জানা সবাই একে একে হারিয়ে গেলে এই ভাষায় কথা বলার আর কেউ থাকবে না।”
রেংমিৎচা ভাষার অস্তিত্ব প্রথম নথিবদ্ধ করেন ম্রো ও খুমী জনগোষ্ঠী নিয়ে গবেষণাকারী জার্মান নৃবিজ্ঞানী লরেন্স জি. লোফলার। ১৯৬০ সালে প্রকাশিত তাঁর গবেষণাগ্রন্থে ভাষাটি ও এর ভাষাভাষীদের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরে নব্বইয়ের দশক থেকে মার্কিন ভাষাবিজ্ঞানী ডেভিড জে. পিটারসন ভাষাটি নিয়ে নিবিড় গবেষণা শুরু করেন। লোফলারের তথ্য অনুসরণ করে আলীকদমের দুর্গম তৈনখাল এলাকায় ঘুরে তিনি রেংমিৎচা ভাষায় কথা বলতে পারেন এমন ৩০ জন মানুষের সন্ধান পান।
ভাষাটিকে সংরক্ষণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। ম্রো লেখক ইয়াং ঙান রেংমিৎচা ভাষা নিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। বর্তমানে গবেষক আফসানা ফেরদৌস আশা ভাষাটি নিয়ে পিএইচডি গবেষণা করছেন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটও ভাষাটি নিয়ে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছে। গবেষকদের মতে, ভাষাটি বিলুপ্ত হয়ে গেলেও এসব গবেষণা ও নথিপত্র ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এর অস্তিত্বের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হয়ে থাকবে।
১৯৮৯ সালের পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইনে পার্বত্য চট্টগ্রামে ১০টি ভাষাভাষী ১১টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাসের কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরেই রেংমিৎচা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী মূলধারার গবেষণা ও প্রশাসনিক আলোচনার বাইরে ছিল।
বান্দরবান সদর উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান সুচিত্রা তঞ্চঙ্গ্যা জানান, নব্বইয়ের দশকে তঞ্চঙ্গ্যা ভাষাকে স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠায় তঞ্চঙ্গ্যা কল্যাণ সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পরে বান্দরবান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট (কেএসআই) তঞ্চঙ্গ্যা ভাষার বর্ণমালাও প্রকাশ করে।
কেএসআইয়ের সাবেক পরিচালক মং নু চিং বলেন, তখনও অনেকের জানা ছিল না যে বান্দরবানে রেংমিৎচা নামে আরেকটি ভাষা টিকে আছে। জীবনযাপন ও সংস্কৃতিতে ম্রোদের সঙ্গে সাদৃশ্য থাকায় সবাই তাঁদের ম্রো হিসেবেই চিনতেন। পরে ডেভিড জে. পিটারসনের গবেষণার মাধ্যমে বিষয়টি সামনে আসে। ২০০৭ সালে বান্দরবান প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি প্রথমবারের মতো রেংমিৎচা ভাষার অস্তিত্ব ও ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর তথ্য জনসমক্ষে তুলে ধরেন।
সম্প্রতি আলীকদমে রেংপুং ম্রো হেডম্যানের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, বছরের পর বছর ধরে ভাষাভাষীর সংখ্যা কমতে কমতে ছয়জনে নেমে এসেছিল। তখনই তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, “রেংমিৎচা জানা সবাই বয়োবৃদ্ধ। তারা আর কতদিন বাঁচবে?”
সেই আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে। আফসানা ফেরদৌসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৫ মে মাংওয়াই ম্রোর মৃত্যু হয়েছে। এর ফলে ভাষাটি জানেন এমন মানুষের সংখ্যা এখন মাত্র পাঁচজন।
বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য এবং ম্রো ভাষার কবি-সাহিত্যিক সিং ইয়ং ম্রো বলেন, ম্রো জনগোষ্ঠীর বসবাস বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মিয়ানমার, চীন ও থাইল্যান্ডে রয়েছে। তবে বাংলাদেশের ভেতরে তাদের একমাত্র আবাসস্থল বান্দরবান। তিনি বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামের চতুর্থ বৃহত্তম নৃগোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে।”
চিম্বুক অঞ্চল ছাড়াও আলীকদমের তৈনখাল অববাহিকায় বহু ম্রো পরিবারের বসবাস। গবেষণাকালে ডেভিড জে. পিটারসন এই এলাকাতেই রেংমিৎচা ভাষার শেষ আশ্রয় খুঁজে পান। ক্রাংসি পাড়া ও আশপাশে তিনি ভাষাটি জানা কয়েকজন মানুষের সন্ধান পান। তাঁদের মধ্যে ছিলেন একই পরিবারের তিন ভাই মাংপুং ম্রো, রেংপুং ম্রো ও মাংওয়াই ম্রো; পাশাপাশি ছিলেন মেনসিং পাড়ার থোয়াই লক ম্রো এবং ক্রাংসি পাড়ার দুই নারী কুনরাও ম্রো।
জীবিকার প্রয়োজনে একই পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ায় ভাষার চর্চাও ক্রমেই কমে যায়। বর্তমানে মাংপুং ম্রো বসবাস করছেন আলীকদমের ক্রাংসি এলাকায়, রেংপুং ম্রো নাইক্ষ্যংছড়ির ওয়াইবট এলাকায় এবং প্রয়াত মাংওয়াই ম্রোর বাড়ি ছিল সাং প্লইং এলাকায়।
তরুণ ম্রো লেখক ইয়াং ঙান মনে করেন, ভাষাটি জানা মানুষগুলো যদি একই গ্রামে একসঙ্গে বসবাস করতেন, তবে অন্তত মাতৃভাষার চর্চা কিছুটা হলেও টিকে থাকতে পারত। তাঁর প্রশ্ন, “আমাদের রাষ্ট্র কি একটি ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য উদ্যোগ নিতে পারে না?”