কোরবানি ঈদের বাকি আর মাত্র দুই সপ্তাহ। এর মাঝেই বন্দর নগরী চট্টগ্রামসহ আশপাশের উপজেলাগুলোর পশুর হাটগুলোতে জমতে শুরু করেছে ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাক। এবার চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সাগরিকা পশুর হাট, বিবিরহাটসহ স্থায়ী-অস্থায়ী হাটগুলোতে পশু সরবরাহ এবং দামের নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। একদিকে গো-খাদ্যের চড়া দামের কারণে বিক্রেতারা হাঁকাচ্ছেন চড়া মূল্য, অন্যদিকে উৎসবের এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে হাটে জাল টাকার জাল বিছিয়েছে প্রতারক চক্র। একই সাথে সক্রিয় হয়ে উঠেছে অজ্ঞান ও মলম পার্টির সদস্যরা।জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এবার চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর বাজারে বড় ধরনের সমীকরণ দেখা যাচ্ছে।মোট চাহিদা ৮ লাখ ১৮ হাজার ৬৭১টি গবাদিপশু।
স্থানীয় প্রস্তুতকৃত পশু ৭ লাখ ৮৩... ১৫১টি (যার মধ্যে গরুর পাশাপাশি ৪১ হাজার ৪২৩টি ভেড়াও রয়েছে)।প্রায় ৩৫ হাজার ৫২০টি পশু।
প্রাণিসম্পদ বিভাগ অবশ্য আশ্বস্ত করেছে যে, এই ঘাটতি খুব একটা প্রভাব ফেলবে না। উত্তরবঙ্গ, কুষ্টিয়া, কুমিল্লা এবং ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা গরুর মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণ করা হবে। ইতিমধ্যেই ট্রাক ও ট্রেইলারে করে কোরবানি পশুর প্রথম চালানগুলো চট্টগ্রামের হাটগুলোতে ঢুকতে শুরু করেছে।চট্টগ্রাম ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের মতে, সয়াবিনের খৈল (যা ২৬০০ টাকা থেকে একলাফে ৩৩০০ টাকা হয়েছে) এবং অন্যান্য গো-খাদ্যের অস্বাভাবিক দাম বাড়ার কারণে এবার পশুর উৎপাদন খরচ অনেক বেশি।বাজারে সবচেয়ে বেশি চাহিদা মাঝারি ও ছোট সাইজের (১০০ থেকে ১৫০ কেজি মাংসের) গরুর। তবে বিক্রেতারা জানিয়েছেন, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে গত বছরের তুলনায় এবার প্রতিটি গরুর দাম নূন্যতম ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বেশি গুনতে হতে পারে।শহরের রূপালী এগ্রো বা সারা এগ্রোর মতো বড় বড় খামারগুলো আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ "হিট কালেকশন" প্রস্তুত করেছে। বড় শৌখিন গরুগুলোর দাম লাখ ছাড়িয়ে কয়েক লাখে গিয়ে ঠেকছে, যার মূল ক্রেতা করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও উচ্চবিত্তরা।
হাটে যখন লাখ লাখ টাকার লেনদেন চলে, ঠিক তখনই অন্ধকারের কারবারিরা নামে মাঠে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাগরিকা ও বিবিরহাটের মতো বড় হাটগুলোর আশপাশে ও ভেতরে ইতিমধ্যেই সক্রিয় হয়েছে "জাল নোট সিন্ডিকেট"।
১০০, ৫০০ এবং ১০০০ টাকার হুবহু নকল নোট জাঁকজমকপূর্ণ হাটের ভিড়ের মধ্যে আসল টাকার ভাজে ঢুকিয়ে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট ছক রয়েছে এদের। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর যখন হাটে আলো-আঁধারির খেলা চলে, তখন বিক্রেতাদের ক্লান্তির সুযোগ নিয়ে এই জাল টাকা গছিয়ে দেওয়া হয়। প্রান্তিক খামারিরা, যারা দূর-দূরান্ত থেকে আসেন এবং সনাতন পদ্ধতিতে টাকা গোনেন, তারাই মূলত এই চক্রের প্রধান শিকার। যদিও পুলিশ প্রশাসন ও ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে জাল নোট শনাক্তকরণ বুথ বসানোর প্রক্রিয়া চলছে, তবে বিপুল ভিড়ের তুলনায় তা পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ ক্রেতা-বিক্রেতাদের।
শুধু জাল নোটই নয়, দূর জেলা থেকে ট্রাকে করে গরু নিয়ে আসা বেপারিদের টার্গেট করছে অজ্ঞান পার্টি ও মলম পার্টির সদস্যরা। চট্টগ্রাম নগরীর প্রবেশপথ—যেমন অলংকার মোড়, কাপ্তাই রাস্তার মাথা, এবং একে খান এলাকায় এদের আনাগোনা বেড়েছে।
কৌশলে চা, ডাব কিংবা কোল্ড ড্রিংকসের সাথে চেতনানাশক মিশিয়ে বেপারিদের অচেতন করে গরুর বিক্রির পুরো টাকা লুটে নেওয়ার কয়েকটি চেষ্টা ইতিমধ্যেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে এসেছে। আবার হাটের ভেতরে ক্রেতা সেজে ভিড়ের মধ্যে চোখে মলম বা মরিচের গুঁড়ো দিয়ে পকেট কাটার সুসংগঠিত দলও সক্রিয় রয়েছে।
এবার চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) তাদের ৩টি স্থায়ী হাট বড় অংকের টাকায় ইজারা দিয়েছে (যেমন- সাগরিকা হাট ইজারা হয়েছে ৮ কোটি ৮ লাখ টাকারও বেশি দামে, বিবিরহাট ৬৮ লাখ ১০ হাজার টাকায়)। তবে অস্থায়ী হাটগুলোর ইজারা মূল্যে কিছুটা ধস নামায় চসিক বড় রাজস্ব হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, এবার পশুর হাটগুলোতে মলম পার্টি ও জাল টাকা চক্র রুখতে গোয়েন্দা নজরদারি দ্বিগুণ করা হয়েছে। ওয়াচ টাওয়ার এবং সিসিটিভি ক্যামেরা দিয়ে পুরো হাট মনিটরিং করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সাধারণ ক্রেতা ও বিক্রেতাদের নিজেদের টাকা লেনদেনে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।