শিরোনামঃ

র‍্যাব ক্যাম্পে ‘ইয়াসিন গ্রুপ’-এর হামলা: পাহাড়ি সন্ত্রাস, খাসজমি দখল আর অস্ত্র বাণিজ্যের অন্ধকার সাম্রাজ্য

বিশেষ প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর যেন আবারও পরিণত হয়েছে ‘রাষ্ট্র বনাম সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’র সংঘর্ষমঞ্চে। গভীর রাতে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) ক্যাম্পে সংঘবদ্ধ সশস্ত্র হামলার ঘটনায় নতুন করে সামনে এসেছে পাহাড়ি দখল, অস্ত্র কারবার, চাঁদাবাজি ও রাষ্ট্রীয় খাসজমি বেহাতের দীর্ঘদিনের ভয়ংকর বাস্তবতা।

সোমবার (২৫ মে) রাত ২টার দিকে জঙ্গল সলিমপুরে অবস্থিত র‍্যাব ক্যাম্পকে চারদিক থেকে ঘিরে গুলি ছোড়ে সন্ত্রাসীরা। আকস্মিক হামলায় মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। র‍্যাব সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুললে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলে গোলাগুলি। রাত ৩টা পর্যন্ত থেমে থেমে গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে পাহাড়ঘেরা জনপদ।

র‍্যাব–৭-এর অধিনায়ক হাফিজুর রহমান হামলার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “ইয়াসিন গ্রুপ নামে পরিচিত সন্ত্রাসী চক্র রাতের অন্ধকারে ক্যাম্পে হামলা চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নন-লিথাল অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। পরে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়।”

যদিও এখন পর্যন্ত হতাহতের আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি, তবে স্থানীয়দের দাবি—রাতভর আতঙ্কে ঘর থেকে বের হতে পারেননি কেউ। ভোর হওয়ার পর যৌথ বাহিনী পুরো এলাকা ঘিরে ব্যাপক তল্লাশি অভিযান শুরু করে।

পাহাড়ের ভেতরে ‘অদৃশ্য রাজত্ব’

জঙ্গল সলিমপুর শুধু একটি পাহাড়ি এলাকা নয়—এটি বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা এক অনিয়ন্ত্রিত ‘ছায়া প্রশাসন’-এর নাম। সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমি নিয়ে গঠিত এই অঞ্চল বর্তমানে অসংখ্য অবৈধ বসতি, পাহাড় কাটা স্থাপনা, মার্কেট ও সন্ত্রাসী আস্তানায় পরিণত হয়েছে।

এলাকাটি মূলত দুটি অংশে বিভক্ত—ছিন্নমূল এলাকা ও আলীনগর। দুর্গম পাহাড়, সরু রাস্তা এবং প্রশাসনের সীমিত উপস্থিতির সুযোগ নিয়ে এখানে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে বিভিন্ন অস্ত্রধারী গোষ্ঠী।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, পাহাড় দখল, ঘর নির্মাণ, জমি বিক্রি, মাদক পরিবহন ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে কোটি টাকার অবৈধ অর্থনীতি। এসব নিয়ন্ত্রণে একাধিক সশস্ত্র গ্রুপ সক্রিয় থাকলেও ‘ইয়াসিন গ্রুপ’ বর্তমানে সবচেয়ে প্রভাবশালী বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা।

র‍্যাব কর্মকর্তার মৃত্যুর পর থেকেই উত্তেজনা

গত ১৯ জানুয়ারি একই এলাকায় অভিযানে গিয়ে প্রাণ হারান র‍্যাবের উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন। তিনি মূলত বিজিবির নায়েব সুবেদার ছিলেন এবং প্রেষণে র‍্যাবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

সেদিনও সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হন আরও তিন র‍্যাব সদস্য ও একজন সোর্স। ওই ঘটনার পর থেকেই জঙ্গল সলিমপুরকে ঘিরে নতুন করে কঠোর অবস্থানে যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

র‍্যাবের দাবি, তাদের টার্গেট ছিল অস্ত্র বাণিজ্য ও পাহাড়ি সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণকারী একটি চক্র। হামলাকারীদের মধ্যে চিহ্নিত সন্ত্রাসী, ভূমিদস্যু এবং অস্ত্র কারবারিদের উপস্থিতির তথ্যও রয়েছে গোয়েন্দাদের কাছে।

সরকারি পরিকল্পনায় জঙ্গল সলিমপুরে কারাগার, আইটি পার্কসহ অন্তত ১১টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দখলদার ও সন্ত্রাসী নিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতির কারণে আজও প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।

ভূমি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, জমি পুনরুদ্ধারে অভিযান চালালেই সংঘবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয় প্রশাসনকে। স্থানীয়দের অভিযোগ—রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া, দুর্বল নজরদারি ও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনাই জঙ্গল সলিমপুরকে ‘রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক রাষ্ট্রে’ পরিণত করেছে।

আতঙ্কে সাধারণ মানুষ

রাতের গোলাগুলির ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সংঘর্ষের মাঝখানে পড়ে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।

একাধিক বাসিন্দা জানান, সন্ধ্যার পর এলাকায় চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। শিশু ও নারীদের নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটছে তাদের।

প্রশ্ন উঠছে নিরাপত্তা কৌশল নিয়েও

একই এলাকায় কয়েক মাসের ব্যবধানে র‍্যাব সদস্য নিহতের ঘটনা এবং এবার সরাসরি ক্যাম্পে হামলা—এসব ঘটনায় নিরাপত্তা কৌশল নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযান নয়, পাহাড়ি দখল অর্থনীতি ও অস্ত্রের উৎস বন্ধ না করলে জঙ্গল সলিমপুরে স্থায়ী শান্তি ফিরবে না।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারে অভিযান চলমান রয়েছে। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—“অভিযান শেষ হলে আবারও কি আগের মতোই দখল আর সন্ত্রাসের রাজত্ব ফিরে আসবে?

বিষয়:

এলাকার খবর

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL