দেশের সড়কে নিরাপত্তাহীনতার চিত্র আবারও সামনে এসেছে। শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই সারাদেশে ৪৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪২৩ জন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৬৭৪ জন। নিহতদের মধ্যে ৭৩ জন নারী এবং ৬১ জন শিশু।
সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে মোটরসাইকেল। এক মাসে ১৫৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ১৩৯ জন। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৩৫ শতাংশই মোটরসাইকেলকেন্দ্রিক।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সেপ্টেম্বর মাসের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। রবিবার (৪ অক্টোবর) প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, অনলাইন সংবাদমাধ্যম, ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সংস্থাটির নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে মাসিক হিসাবটি প্রস্তুত করা হয়েছে।
দুর্ঘটনার স্থান বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর মাসে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে। এ ধরনের সড়কে ১৭৮টি দুর্ঘটনা ঘটে, যা মোট দুর্ঘটনার ৪০ শতাংশের বেশি।
এ ছাড়া জাতীয় মহাসড়কে ১৪৫টি, শহরের সড়কে ৬৩টি এবং গ্রামীণ সড়কে ৫৬টি দুর্ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে।
দুর্ঘটনার ধরনেও রয়েছে উদ্বেগজনক চিত্র। ১৬৮টি ঘটনায় যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর বিষয়টি সামনে এসেছে। ১০৯টি দুর্ঘটনায় পথচারী চাপা পড়া বা ধাক্কার শিকার হয়েছেন। মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে ৯৮টি এবং পেছন থেকে অন্য যানবাহনে ধাক্কার ঘটনা ঘটেছে ৬১টি।
সেপ্টেম্বরের দুর্ঘটনাগুলোতে ১০৬ জন পথচারী নিহত হয়েছেন। মোট প্রাণহানির প্রায় এক-চতুর্থাংশই পথচারী।
যানবাহনভিত্তিক হিসাবেও মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীদের প্রাণহানি সবচেয়ে বেশি—১৩৯ জন। থ্রি-হুইলারে ৮৮ জন এবং বাসে ২৬ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া নিহতদের মধ্যে যানবাহনের চালক ও সহকারীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য, ৫৩ জন।
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। সেপ্টেম্বরে এ বিভাগে ১৩২টি দুর্ঘটনায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৩০ শতাংশ এবং মোট প্রাণহানির ৩১ শতাংশের বেশি ঢাকা বিভাগে ঘটেছে।
চট্টগ্রাম বিভাগেও দুর্ঘটনার চিত্র উদ্বেগজনক। সারাদেশের মোট দুর্ঘটনার ১৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ এবং প্রাণহানির ১৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ এ বিভাগে ঘটেছে।
অন্যদিকে একক জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি ৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে গাজীপুরে। বিভাগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে সিলেটে—২০টি ঘটনায় ২১ জন নিহত হয়েছেন।
রাজধানী ঢাকায় সেপ্টেম্বর মাসে ৫২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ৪৭ জন।
শুধু সড়ক নয়, সেপ্টেম্বর মাসে অন্যান্য পরিবহন ব্যবস্থাতেও প্রাণহানি ঘটেছে। ১১টি নৌ দুর্ঘটনায় ১৬ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন সাতজন এবং নিখোঁজ রয়েছেন চারজন।
একই সময়ে রেলপথে ২৩টি দুর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত এবং ছয়জন আহত হয়েছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সেপ্টেম্বর মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৪ জন করে প্রাণ হারিয়েছেন। দুর্ঘটনার পেছনে অতিরিক্ত গতি ও যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।
সংস্থাটির মতে, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, চালকদের অদক্ষতা, বেপরোয়া গতি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, চালকের শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা, ট্রাফিক আইন না মানা এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
এ ছাড়া মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহনের চলাচল, তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ মোটরসাইকেল চালানো এবং বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতিকেও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সড়কে মৃত্যুর এই ধারাবাহিকতা ঠেকাতে গতি নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। একই সঙ্গে চালকদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণার সুপারিশও রয়েছে।
সংস্থাটি জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন, বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএর কাঠামোগত সংস্কার, আধুনিক সড়ক নিরাপত্তা প্রযুক্তি চালু এবং মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
একই সঙ্গে মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক সার্ভিস রোড, রেলক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগ এবং সড়ক, রেল ও নৌপরিবহন ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের সারকথা—সড়কে দুর্ঘটনা কমাতে শুধু চালককে দায়ী করলেই হবে না; নিরাপদ যানবাহন, সড়ক অবকাঠামো, কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং দায়িত্বশীল পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বিত উদ্যোগই পারে প্রাণহানি কমাতে।