শিরোনামঃ

পেকুয়ায় আড়তদারদের কাছে জিম্মি ৪২ ক্ষুদ্র মাছ ব্যবসায়ী, মাছ বিক্রি বন্ধ

নাজিম উদ্দিন, পেকুয়া:
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র কবির আহমদ চৌধুরী বাজার (পেকুয়া বাজার) এর মাছের বাজারে আড়তদারদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে মাছ বিক্রি বন্ধ রেখেছেন ৪২ জন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। আড়তদারদের নিয়ন্ত্রণ, অসম দামে মাছ বিক্রি, দাদনের টাকা এবং অতিরিক্ত দামে মাছ কিনতে বাধ্য করার অভিযোগ তুলে ব্যবসায়ীরা এ কর্মসূচি পালন করছেন।

 

ব্যবসায়ীদের দাবি, দাবি-দাওয়া মেনে না নেওয়া পর্যন্ত তারা মাছ বিক্রি করবেন না। এতে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পেকুয়া বাজারের মাছের দোকানগুলো বন্ধ থাকায় দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা।

 

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পেকুয়া বাজারে প্রতিদিন প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকার বিভিন্ন জাতের মাছ কেনাবেচা হয়। মাছ কেনাবেচার জন্য বাজারে তিনতলা বিশিষ্ট আলাদা ভবন রয়েছে। সেখানে চারজন আড়তদার ব্যবসা পরিচালনা করেন। তাঁদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে প্রায় ৪২ জন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নিয়মিত মাছের ব্যবসা করে আসছেন।

 

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দাদন নেওয়ার কারণে তাদের অনেকটা বাধ্য হয়েই সংশ্লিষ্ট আড়তদারদের কাছ থেকে মাছ কিনতে হয়। একই সঙ্গে আড়তদাররা নির্দিষ্ট সময়ের পরও আড়ত খোলা রেখে খুচরা মাছ বিক্রি করায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না।

 

ব্যবসায়ীরা আরও অভিযোগ করেন, সকাল, দুপুর ও বিকেলে একই জাতের মাছ ভিন্ন ভিন্ন দামে বিক্রি করা হয়। সকালে আড়ত থেকে মাছ কিনলে তুলনামূলক বেশি দাম দিতে হয়। পরে দুপুর বা বিকেলে একই মাছ কম দামে বিক্রি করা হয়। ফলে সকালে বেশি দামে মাছ কেনা ব্যবসায়ীরা দিন শেষে লোকসানে পড়েন।

 

তাদের ভাষ্য, বেশি দামে মাছ কেনার কারণে ক্রেতাদের কাছেও বেশি দামে মাছ বিক্রি করতে হয়। এতে ক্রেতারা বেশি দামে মাছ কিনতে অনাগ্রহী হন। আবার কম দামে বিক্রি করলে ব্যবসায়ীদের লোকসান হয়। অনেক সময় সারাদিন মাছ বিক্রি করেও মাছ অবিক্রীত থেকে যায়।

 

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দিন শেষে আড়তদারদের মাছের পুরো টাকা পরিশোধ করতে হয়। লোকসানের কারণে সময়মতো টাকা দিতে না পারলে আড়তদারদের কাছ থেকে গালমন্দ ও অপমানজনক আচরণের শিকার হতে হয়। এভাবে লোকসান গুনতে গুনতে অনেক ব্যবসায়ী দেনায় পড়ে ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন বলেও দাবি করেন তারা।

 

মাছ ব্যবসায়ী ইসমাইল বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই বাজারে মাছের ব্যবসা করে আসছি। আড়তদারদের কাছ থেকে দাদন নেওয়ার কারণে তাদের কাছ থেকেই মাছ কিনতে হয়। কিন্তু একই মাছ একেক সময় একেক দামে বিক্রি করা হয়। সকালে বেশি দামে কিনে ব্যবসা করলে পরে কম দামে মাছ বিক্রি করা হয়। এতে আমাদের প্রতিদিন লোকসান হচ্ছে। আমরা ব্যবসা করতে চাই, কিন্তু এভাবে লোকসান দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

 

আরেক ব্যবসায়ী ছরওয়ার বলেন, আমরা চারজন আড়তদারের কাছে ৪২ জন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অনেকটা জিম্মি হয়ে আছি। তারা একই সঙ্গে আড়তদারি ও খুচরা মাছ বিক্রি করায় আমাদের ব্যবসায় মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। আমরা চাই আড়তদাররা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আড়ত চালাবেন এবং এরপর আড়ত বন্ধ রাখবেন। এতে আমরা ন্যায্যভাবে ব্যবসা করার সুযোগ পাব।

 

ব্যবসায়ী আবছার বলেন, আড়তদাররা নিজেদের মধ্যে তালমিল করে মাছের দাম বাড়িয়ে দেন এমন অভিযোগ আমাদের রয়েছে। আমরা বেশি দামে মাছ কিনতে বাধ্য হই। পরে সেই দামে মাছ বিক্রি করতে গেলে ক্রেতারা কিনতে চান না। আবার কম দামে বিক্রি করলে আমাদের লোকসান হয়। এভাবে ব্যবসা করতে গিয়ে আমরা দেনায় পড়ে গেছি। আমাদের ন্যায্য দাবি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত মাছ বিক্রি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

 

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আড়তদাররা প্রতি লাখ টাকা মাছের কেনাবেচায় ৫ হাজার টাকা করে আদায় করেন। তাদের দাবি, আড়তদারদের আড়ত পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা উচিত।

 

ব্যবসায়ীদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে সকাল ৫টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত আড়ত খোলা রাখা, এরপর আড়ত বন্ধ রাখা এবং আড়তদারদের বর্তমান অবস্থান পরিবর্তন করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া। একই সঙ্গে বাইরে থেকে মাছ নিয়ে আসা ব্যবসায়ীদেরও বাজারে বসে মাছ বিক্রির সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

 

মাছের দোকানের ইজারাদার  আব্দুল মান্নান বলেন, প্রতিদিন এই বাজারে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকার মাছ কেনাবেচা হয়। আড়তদাররা প্রতি লাখে ৫ হাজার টাকা করে আদায় করেন। অথচ ইজারাদার হিসেবে আমি হাসিল পাই মাত্র ৫ হাজার টাকা। আমার প্রস্তাব হচ্ছে, সকাল ৫টা থেকে ১০টা পর্যন্ত আড়ত খোলা থাকবে। এরপর আড়ত বন্ধ রাখতে হবে।

 

তিনি আরও বলেন, বাইরে থেকে যারা মাছ এনে বিক্রি করতে চান, তাদেরও সিটে বসে মাছ বিক্রির সুযোগ দেওয়া হবে। ইজারাদারের পক্ষ থেকে তাদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে এবং তাদের কাছ থেকে কম হাসিল নেওয়া হবে।

 

এদিকে ব্যবসায়ীদের মাছ বিক্রি বন্ধ রাখায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। বাজারে মাছ কিনতে এসে অনেকেই খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন।

 

একজন নারী ক্রেতা বলেন, সকালে মাছ কিনতে এসে দেখি সব দোকান বন্ধ। দুপুরে রান্নার জন্য মাছ কিনতে এসেছিলাম। এখন মাছ না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের সমস্যা থাকতে পারে, কিন্তু এতে আমাদেরও ভোগান্তি হচ্ছে।

 

রাসেল নামে এক ক্রেতা বলেন, বাড়িতে মেহমান এসেছে। মাছ কিনতে বাজারে এসে দেখি সব দোকান বন্ধ। ব্যবসায়ীদের নিজেদের দ্বন্দ্বের কারণে সাধারণ ক্রেতাদের কেন কষ্ট পেতে হবে? আমাদের বিষয়টি বিবেচনা করে দ্রুত সমস্যার সমাধান করা উচিত।

 

ব্যবসায়ীরা জানান, তাদের দাবি-দাওয়া মেনে না নেওয়া পর্যন্ত মাছ বিক্রি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে তারা অনড় থাকবেন। তাদের দাবি, আড়তদারদের নিয়ন্ত্রণ ও দাদননির্ভর ব্যবসা থেকে মুক্তি পেলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ন্যায্যভাবে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ পাবেন।

 

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আমি শুনেনি। আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি। ইজারাদারের সঙ্গে কথা বলবো। আড়তদার নিদিষ্ট সময়ে খোলা থাকবে এটাতো স্বাভাবিক। সব সময় খোলা থাকবে এটাতো হতে পারেনা।

বিষয়:

এলাকার খবর

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL