শিরোনামঃ

স্বাধীনতা ৫৫ বছরেও ছিল না কোনো বিদ্যালয়,  আলো  পৌঁছেনি; কোমলমতি  ৭০ শিশুর 

মোঃ সুমন খান
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি: দৈনিক দেশের কথা
ছবি: দৈনিক দেশের কথা

চারদিকে পাহাড় আর সবুজ অরণ্য। দুর্গম পথ, দীর্ঘ যাত্রা। কাপ্তাই জেটিঘাট থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা নৌপথ পেরিয়ে আরও প্রায় দুই ঘণ্টা পাহাড়ি পথ হেঁটে যেতে হয় এই জনপদে। কাপ্তাই, বিলাইছড়ি ও রাজস্থলী—তিন উপজেলার সীমান্তবর্তী এই এলাকায় একসময় শিক্ষার সুযোগ ছিল প্রায় শূন্যের কোঠায়।

স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও ১৩০ নম্বর বারুদগোলা মৌজায় ছিল না কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যুতের আলোও পৌঁছেনি। ফলে দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, আর্থিক সংকট ও বিদ্যালয়ের অভাবে অনেক শিশুর শিক্ষাজীবন শুরু হওয়ার আগেই থেমে যেত।

এই বাস্তবতায় ২০২৩ সালে স্থানীয় উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করা হয় শুভধন পাড়া সংঘরাজ শীলালংকার মহাথের বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রায় ৭০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। আশপাশের সব শিশু বিদ্যালয়ের আওতায় এলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
‘শিক্ষার সুযোগ থেকে যেন কোনো শিশু বঞ্চিত না হয়’
বিদ্যালয়টির প্রধান উদ্যোক্তা ও সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন ভদন্ত বুদ্ধজ্যোতি ভিক্ষু (ভাগ্যজিৎ তঞ্চঙ্গ্যা)। তাঁর উদ্যোগ ও প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে বিদ্যালয়টির কার্যক্রম এগিয়ে যায়।

ভদন্ত বুদ্ধজ্যোতি ভিক্ষু বলেন ,,এই এলাকার শিশুরা যেন শুধু দুর্গমতার কারণে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়—সেই চিন্তা থেকেই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। অনেক কষ্ট করে শিশুরা এখানে পড়তে আসে। আমাদের ইচ্ছা, এই বিদ্যালয়কে আরও ভালোভাবে গড়ে তুলে এলাকার প্রতিটি শিশুকে শিক্ষার আওতায় আনা।”
বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় কানাডায় অবস্থানরত প্রজ্ঞাশ্রী ভিক্ষু, শ্রীলঙ্কায় অবস্থানরত বিপসসি ভান্তে, কলেজ শিক্ষক অমর বিকাশসহ এলাকার কয়েকজন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন।

স্থানীয় এক অভিভাবক বলেন, আগে এখান থেকে দূরের বিদ্যালয়ে সন্তানদের পাঠানো খুবই কঠিন ছিল। পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে প্রতিদিন যাওয়া-আসা করা সম্ভব হতো না। এখন পাড়ার কাছেই স্কুল হওয়ায় ছেলে-মেয়েরা নিয়মিত পড়াশোনা করতে পারছে।”
‘বিনা বেতনেই পড়াচ্ছেন শিক্ষকরা’

বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো বেতন নেওয়া হয় না। আমরা সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে স্বেচ্ছাশ্রমে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু দীর্ঘদিন এভাবে চালানো কঠিন। বিদ্যালয়ের স্থায়ী ব্যবস্থা ও সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন।”
অবকাঠামো সংকট
বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষা উপকরণ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। দুর্গম এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার পরিবেশও নানা সমস্যার মুখে পড়ে।
তবে এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও বই-খাতা হাতে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে ছুটে আসে শিশুরা। তাদের চোখে ভবিষ্যৎ বদলের স্বপ্ন।

স্থানীয়দের দাবি, বিদ্যালয়টি দ্রুত জাতীয়করণের আওতায় আনা হলে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকেরাও স্থায়ীভাবে উপকৃত হবেন। বর্তমানে বিনা বেতনে কাজ করা শিক্ষকেরা প্রশিক্ষণ, পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন, আর্থিক নিরাপত্তা ও পেশাগত স্থায়িত্বের সুযোগ পাবেন।

স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, সরকার যদি বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ করে, তাহলে শুধু এই ৭০টি শিশু নয়, আশপাশের আরও শতাধিক শিশু শিক্ষার সুযোগ পাবে। পাশাপাশি শিক্ষক ও বিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎও নিশ্চিত হবে।”
‘সরকারি সহযোগিতা পেলে আরও অনেক দূর এগোবে’
বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি স্বীকৃতি ও সহযোগিতা পেলে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার কমবে এবং দুর্গম পাহাড়ি জনপদের শিক্ষার সুযোগ আরও বিস্তৃত হবে।

ভদন্ত বুদ্ধজ্যোতি ভিক্ষু আরও বলেন, আমরা চাই বিদ্যালয়টি সরকারি স্বীকৃতি পাক। এতে শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ ও পেশাগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবেন, তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তা তৈরি হবে। সবচেয়ে বড় কথা, দুর্গম এলাকার দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য শিক্ষার একটি স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।”

পাহাড়ের দুর্গম পথ, বিদ্যুতের অভাব ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও শুভধন পাড়া বিদ্যালয় এখন এই জনপদের মানুষের কাছে আশার প্রতীক। যে এলাকায় স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও কোনো বিদ্যালয় ছিল না, সেখানে আজ প্রায় ৭০ শিশু বই-খাতা হাতে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সরকারি উদ্যোগে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ করা হলে পাহাড়ের এই দুর্গম জনপদে শিক্ষার আলো আরও বিস্তৃত হবে এবং বদলে যাবে বহু শিশুর ভবিষ্যৎ।

বিষয়:

এলাকার খবর

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL