শিরোনামঃ

উত্তর চট্টগ্রামের যোগাযোগে নতুন দিগন্ত
কুলগাঁওয়ে ৩৩ বছর পর নগরীর তৃতীয় বাস টার্মিনাল, চালু হচ্ছে চলতি মাসেই

ইয়াছির আরফাত
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ ৩৩ বছর পর চট্টগ্রাম নগরীতে যুক্ত হতে যাচ্ছে নতুন একটি আধুনিক বাস টার্মিনাল। নগরীর জালালাবাদ ওয়ার্ডের কুলগাঁও-বালুচরা এলাকায় প্রায় ৮ দশমিক ১০ একর জায়গাজুড়ে নির্মিত কুলগাঁও বাস-ট্রাক টার্মিনাল চলতি সেপ্টেম্বরেই উদ্বোধনের পর যাত্রীসেবায় যুক্ত করার প্রস্তুতি চলছে। টার্মিনালটি চালু হলে উত্তর চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িমুখী দূরপাল্লার এবং আন্তঃনগর বাসগুলো নির্ধারিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আসবে। একই সঙ্গে সড়কের ওপর যত্রতত্র বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামার প্রবণতা কমবে এবং অক্সিজেনসহ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথে যানজটও অনেকটা কমে আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম নগরীতে বর্তমানে কদমতলী ও বহদ্দারহাটে দুটি বাস টার্মিনাল রয়েছে। এর মধ্যে কদমতলীর টার্মিনালটি নির্মিত হয় ১৯৬৬ সালে। প্রায় ২৭ বছর পর ১৯৯৩ সালে নির্মাণ করা হয় বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নগরীতে নতুন কোনো বাস টার্মিনাল নির্মাণ হয়নি। সেই হিসেবে কুলগাঁওয়ের এই প্রকল্পটি নগরীর তৃতীয় বাস টার্মিনাল হিসেবে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে।
★★যানজট নিরসনে বড় ভূমিকার আশা
চট্টগ্রাম নগরীর উত্তরমুখী বাস চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ অক্সিজেন মোড়। প্রতিদিন রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, হাটহাজারী, নাজিরহাট, রাঙ্গুনিয়াসহ উত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন রুটের বিপুলসংখ্যক বাস এ পথ ব্যবহার করে। কিন্তু এসব রুটের জন্য এতদিন নির্দিষ্ট কোনো বাস টার্মিনাল না থাকায় নগরীর বিভিন্ন সড়কের পাশে কিংবা ব্যস্ত এলাকায় বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করতে হতো।
বিশেষ করে মুরাদপুর ও অক্সিজেন এলাকায় বাসের অবস্থান, যাত্রী ওঠানামা এবং অপেক্ষমাণ যানবাহনের কারণে প্রায়ই যানজট তৈরি হয়। নতুন টার্মিনাল চালু হলে এসব বাসকে নির্ধারিত স্থানে এনে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। ফলে নগরীর প্রধান সড়কে যানবাহনের চাপ কমার পাশাপাশি গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি বাস মালিক সমিতির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম-রাঙামাটি মহাসড়ক হয়ে উত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন রুটে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ বাস চলাচল করে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম-নাজিরহাট-খাগড়াছড়ি বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির নেতারাও বলছেন, উত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন গন্তব্যে প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক বাস নিয়মিত চলাচল করে। স্থায়ী টার্মিনাল না থাকায় এসব বাসকে সড়কের ওপর দাঁড়িয়েই যাত্রী সংগ্রহ করতে হয়।
★★আট বছরে শেষ হলো প্রকল্প
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) ২০১৮ সালের অক্টোবরে সিটি বাস টার্মিনাল প্রকল্পটি অনুমোদন করে। তবে নানা প্রশাসনিক ও বাস্তব জটিলতায় নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। প্রায় আট বছর পর এখন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের শেষ ধাপে এসে পৌঁছেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, টার্মিনালের মূল অবকাঠামোর বড় অংশের কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে ভবনের অভ্যন্তরীণ ফিনিশিং, বাগান নির্মাণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ চলছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চলতি মাসের মধ্যেই এসব কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক ও চসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জসীম উদ্দিন জানান, টার্মিনালের মূল ভবনের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ। বর্তমানে ফিনিশিং, বাগান ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ চলছে। চলতি মাসের মধ্যেই কাজ শেষ করার আশা করছেন তারা।
★★ব্যয় ১৩৯ কোটি টাকার বেশি
প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন খাতে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হয়েছে। জমি অধিগ্রহণে ব্যয় হয়েছে ১০৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা। ভূমি উন্নয়নে ব্যয় হয়েছে ৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। অবকাঠামো উন্নয়নে আরও ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং ইয়ার্ড নির্মাণে ২৫ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এসব খাতে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩৯ কোটি টাকা।
টার্মিনালে বাস ও ট্রাকের জন্য পৃথক পার্কিং সুবিধা রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১৬০টি বাস-ট্রাক পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে। ফলে উত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক যানবাহন সড়কের পরিবর্তে নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করতে পারবে।
যাত্রীসেবায় থাকছে আধুনিক সুবিধা
নতুন এই টার্মিনালকে শুধু বাস দাঁড়ানোর জায়গা হিসেবে নয়, পূর্ণাঙ্গ যাত্রীসেবা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। প্রবেশমুখে থাকবে তিনতলা একটি ভবন। এর পাশাপাশি থাকছে সিটি বাস ও আন্তঃনগর বাসের জন্য পৃথক টার্মিনাল সুবিধা।
যাত্রীদের ওঠানামার জন্য থাকবে ২৫টি বোর্ডিং লেন। পাশাপাশি অতিরিক্ত ১৪টি ওয়েটিং লেন রাখা হয়েছে। থাকবে বড় খোলা হলরুম, তথ্যকেন্দ্র, নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক শৌচাগার, ২২টি টিকিট কাউন্টার, যাত্রীদের বসার ব্যবস্থা এবং ওয়াই-ফাই সুবিধা।
এ ছাড়া লাগেজ রাখার কক্ষ, ট্যাক্সি বুকিংয়ের জন্য আলাদা কক্ষ, ফার্স্ট এইড স্টেশন, রেস্তোরাঁ, এসি বাসের যাত্রীদের জন্য পৃথক বসার জায়গা, বাস-ট্রাক মালিকদের অফিস এবং বাস কর্মীদের থাকার কক্ষও রাখা হয়েছে।
উপকৃত হবে পার্বত্য দুই জেলার মানুষ
টার্মিনালটি চালু হলে শুধু চট্টগ্রাম নগরীর যানজট কমবে না, উত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য দুই জেলার যাত্রীদের যাতায়াতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি থেকে চট্টগ্রাম নগরীতে আসা যাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট টার্মিনাল সুবিধা তৈরি হবে। একইভাবে চট্টগ্রাম থেকে ওই দুই জেলাসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াতকারী যাত্রীরাও নির্দিষ্ট কাউন্টার, অপেক্ষাকক্ষ ও বোর্ডিং ব্যবস্থার সুবিধা পাবেন।
★★সিদ্ধান্ত মেয়র দেশে ফিরলেই
চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিসুর রহমান সোহেল জানিয়েছেন, কুলগাঁও-বালুচরা বাস টার্মিনালসহ কয়েকটি প্রকল্পের কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। মেয়র দেশে ফেরার পর এসব প্রকল্প উদ্বোধন ও চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। খুব দ্রুতই টার্মিনালটি চালুর প্রত্যাশা করছেন তারা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কুলগাঁও বাস-ট্রাক টার্মিনাল চালু হলে উত্তর চট্টগ্রামের গণপরিবহন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের একটি বড় ঘাটতি পূরণ হবে। একই সঙ্গে অক্সিজেন-মুরাদপুর এলাকার সড়কে বাসের অযাচিত অবস্থান কমিয়ে নগরীর যান চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে টার্মিনাল নির্মাণের পাশাপাশি এর সঙ্গে যুক্ত সড়ক ব্যবস্থাপনা, বাসের রুট নির্ধারণ এবং কঠোরভাবে টার্মিনাল ব্যবহারের নিয়ম কার্যকর করা গেলে প্রকল্পটির সুফল আরও ব্যাপক হবে।

বিষয়:

এলাকার খবর

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL