শিরোনামঃ

‘প্রচন্ড রোদের গরমে কাজ করার পাশাপাশি ধূমপানের নিকোটিন-ভেজাল শুঁটকি ক্যান্সারের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ে’-প্রখ্যাত ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আনোয়ার

ইমরান হোসাইন
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
আনোয়ারা উপজেলার উপকূল এলাকা ছবি: ইমরান হোসাইন
আনোয়ারা উপজেলার উপকূল এলাকা ছবি: ইমরান হোসাইন

চট্টগ্রামের মানুষ প্রধানত দুই ধরনের ক্যান্সারের বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। নারীরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন স্তন ক্যান্সার আর পুরুষরা ফুসফুস ক্যান্সারে। ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের কারণে চট্টগ্রামের মানুষের মধ্যে এ দুই ধরনের ক্যান্সার বেশি হচ্ছে বলে জানিয়েছে চিকিৎসকরা। এরমধ্যে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে শিশু, নারী-পুরুষের মাঝে ক্রমাগত বাড়ছে মরণব্যাধি ক্যান্সারের প্রকোপ। গত দুই বছরে উপজেলার ১১ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় শতাধিক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে সমাজ সেবা অধিদপ্তর।

নতুন করে আক্রান্তের সংখ্যাও আরও শতাধিক। আক্রান্তের বয়স ১৬ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। আক্রান্ত পুরুষদের মধ্যে ফুসফুসে, নারীদের মধ্যে স্তন ও জরায়ু ক্যানসার সবচেয়ে বেশি। ক্যানসারের সবচেয়ে বেশি প্রকোপ দেখা দিয়েছে উপজেলার উপকূলীয় ইউনিয়ন রায়পুরে।

জানা গেছে, ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন রায়পুর গ্রামের মো. কায়সার (৫০) নামে এক ব্যক্তি, দুইমাস আগে মারা যান একই বাড়ির আব্দুল মুবিন (৪০), এরআগে মারা গেছেন রায়পুর গ্রামের পীর সাহেবের বাড়ির আরমান উদ্দিন (১৮), পুজুলির বাড়ির শেখ মোহাম্মদ (১৬), আবুল কালাম (৬০), দর্জিয়ার বাড়ির ইদ্রিস বাঙ্গালী (৫৫), মনির আহম্মদ (৬০), খতির বাপের বাড়ির মো. মিজান (১৭), চুল্লাজামার বাড়ির কিশোর আশিক (১৬), পারভীন আকতার (৩৬), মো. মুছা (৬৫), আশরাফ আলীর বাড়ির মৌলানা ছৈয়দ নুর (৬০), গহিরা গ্রামের মো. আনিস (৪০), দক্ষিণ পরুয়াপাড়ার জাফর আহমদ (৫৫), হাফেজ নুরুল আমিন (৫৫), উত্তর পরুয়াপাড়া নুরুল আলম (৬০)সহ আরও অনেকেই। এতে করে উপকূলীয় রায়পুর এলাকার মানুষদের মনে ক্যান্সার আতঙ্ক বিরাজ করছে। এটি আক্রান্তের সঠিক কারণ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবী জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

সম্প্রতি বৈরাগ ইউনিয়নের গুয়াপঞ্চক এলাকার পাঁচসিকদার বাড়ির আলী আকবর (৩৯), উত্তর গুয়াপঞ্চক এলাকার ধনরঞ্জন ধর (৫০) মারা গেছেন বলেন নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় ইউপি সদস্যপ্রার্থী শাকিল বিন ইসলাম।

এছাড়াও বারখাইন ইউনিয়নের শিলাইগড়া গ্রামের আনোয়ারা হোসেন (৬৫), বরুমচড়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের গৃহবধূ রিমা আকতার (৩৭), বারশত ইউনিয়নের পশ্চিমচাল গ্রামের জাফর আহমদ (৬০)সহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে বেশ কয়েকজন ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে ক্যান্সার আক্রান্তে।

অপরদিকে এখনও আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন রায়পুর গ্রামের মো. মহিউদ্দিন (৫০), মো. ইদ্রীস (৬০), মো. হোসেন (৬০), সরেঙ্গা গ্রামের মো. এনামুল হক (৪০), নারগিস আকতার (২৮), পরুয়াপাড়া গ্রামের চার সন্তানের জননী জেসমিন আক্তার (৪০), মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম (২৭), পশ্চিম রায়পুর গ্রামের ৫ কন্যা সন্তানের জননী দিলুয়ারা বেগম (৫০) ও চাতরী ইউনিয়নের সিংহরা গ্রামের মাস্টার মোহাম্মদ আবদুর রহিম (৩৩)।

স্থানীয় সূত্র জানায়, দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের একমাত্র উপার্জন ব্যক্তি ও কর্তারা ক্যানসার আক্রান্তের কারণে পরিবার গুলো অর্থসংকট, আতঙ্ক ও হতাশায় ভুগছেন। কোন-কোন পরিবার প্রিয়জনকে সুস্থ করে তুলতে শেষ সম্ভব জমি বিক্রি এমনকি ভিটামাটিও বিক্রি করে দিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। অনেকে সমাজের বিত্তবানদের কাছ থেকে সহায়তা নিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিম রায়পুর গ্রামের ৫ কন্যা সন্তানের জননী দিলুয়ারা বেগম (৫০) তাঁর চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন স্বামী মোহাম্মদ আলী। অপরদিকে বারশত ইউনিয়নের পশ্চিমচাল এলাকায় গত তিনবছর ধরে চিকিৎসাধীন রয়েছে ছেনেয়ারা বেগম (৬৫)।

আক্রান্তের স্বজন ও স্থানীয়রা জানায়, নারীরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন স্তন ও জরায়ু ক্যান্সার আর পুরুষরা ফুসফুস ক্যান্সারে। তাদের দেহের খাদ্যনালী, ব্লাড, ঠোঁট, ওরাল ক্যাভিটি ক্যানসারে আক্রান্ত।

ক্যান্সার আক্রান্ত সুস্থ হয়ে ফিরে আসা সাংবাদিক এম আনোয়ারুল হক বলেন, ‘আমার কণ্ঠনালীতে ক্যানসার ধরাপড়লে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হই। চিকিৎসকের পরামর্শে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতও গিয়েছিলাম, আল্লাহর রহমতে এখন আমি সুস্থ। এইরোগে আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। অবহেলা করলে মৃত্যু নিশ্চিত।’

ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের কারণে চট্টগ্রামের আনোয়ারার মানুষের মধ্যে এ দুই ধরনের ক্যান্সার বেশি হচ্ছে বলে জানিয়েছে চিকিৎসকরা। চিকিৎসকরা জানান, ভেজাল খাবার, বায়ূ দূষণ ও তামাক সেবনের কারনে অধিকাংশ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হতে পারে। এছাড়া শিল্প কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়ার কারনেও মানুষের ফুসফুসে ক্যানসার হয়।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রখ্যাত ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আনোয়ার বলেন, ‘প্রথমত; প্রচন্ড রোদের গরমে কাজ করার পাশাপাশি ধূমপানের নিকোটিন। ভেজাল শুঁটকি খাওয়ার কারণে ক্যান্সারের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ারপর প্রথম স্ট্যাজ পার হওয়ারপর রোগ ধরা পড়ায় অনেক সময় রোগী সুস্থ হতে পারেনা। এ ক্ষেত্রে সবাই সচেতনতা জরুরী।’

বিষয়:

এলাকার খবর

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL