শিরোনামঃ

বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য-অভয়াশ্রম পাহাড় বিলুপ্তির পথে বন্য প্রাণী; হুমকিতে জীববৈচিত্র্য!

মামুন, খাগড়াছড়ি
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:


ভৌগোলিক অবস্থান ও ঋতু বৈচিত্র্যের কারণে পার্বত্যাঞ্চলে জীববৈচিত্র্যের সমাহার ঘটেছে। ছোট আয়তনের এ অঞ্চলটি বিভিন্ন ধরনের বন্য প্রাণী সম্পদও বেশ সমৃদ্ধ। কিন্তু পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে পার্বত্যাঞ্চলের খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে বন্য প্রাণী বর্তমানে বিপন্ন। পার্বত্যাঞ্চলের বনভূমি, জলাভূমি বা লোকালয় বিভিন্ন বন্য প্রাণীর উপস্থিতি প্রানবন্ত করে তুলে পাহাড়ের প্রকৃতিকে।

পরিবেশগত দিক থেকেও প্রতিটি বন্য প্রাণীর রয়েছে অপরিসীম অবদান। তবে মানুষের নানামুখী কর্মকান্ডে সংকুচিত হয়েছে বন্য প্রাণীর আবাস্থল ও কমেছে এদের সংখ্যা। কিছু প্রজাতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোষ্ঠীতে পরিনত হয়েছে আর কিছু সম্পূর্নরূপে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বন্য প্রাণীর যে প্রজাতিগুলো টিকে আছে সেগুলোও বর্তমানে বিপন্ন।

চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে বিগত কয়েক দশকে বেশ কিছু বন্যপ্রাণী পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং আরও অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির পথে রয়েছে।

পার্বত্য অঞ্চলে বিলুপ্ত ও হুমকির মুখে থাকা বন্যপ্রাণী ২০১৫ সালের রেড লিস্ট জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৩১ প্রজাতির প্রাণী তারমধ্যে ১১টি স্তন্যপায়ী, ১৯টি পাখি ও ১টি সরীসৃপ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এর একটি বড় অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চলে বাস করত।

পার্বত্য অঞ্চল থেকে হারিয়ে যাওয়া বা বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীগুলোর মধ্যে রয়েছে বনগরু, সম্বর হরিণ, বন্য মহিষ, গণ্ডার, চিতা বাঘ, উল্লুক, লজ্জাবতী বানর, তক্ষক, রাজ ধনেশ পাখি ইত্যাদি।

এছাড়া সংকটাপন্ন প্রাণীর মধ্যে বর্তমানে হাতি, হরিণ, সজারু, হনুমান, বনমোরগ, মথুরা, শঙ্খিনী, বনছাগলসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণী চরম অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে।

স্থানীয়রা বলছেন, নির্বিচারে বনভূমি উজার হওয়ায় ফলে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য ঠিক না থাকায় দিনদিন দেশের অন্যান্য স্থানের মতো পাহাড়েও বন্য প্রাণী কমছে। একসময় এ অঞ্চলে বাঘ, হরিণ, চিতা সহ নানা ধরনের বন্য প্রাণী দেখা যেত। যা এখন বিলুপ্ত।

পরিবেশ ও বন্য প্রাণী রক্ষায় প্রাণীদের আবাসস্থল, প্রজননক্ষেত্র বৃদ্ধি এবং বৃক্ষ নিধন, ক্ষতিকর তামাক চাষ, ইটভাটার কালো ধোঁয়া প্রতিরোধ করতে হবে। এছাড়া শুধু নির্দিষ্ট দিবস কেন্দ্রিক সভা-সেমিনার কিংবা ব্যানারের প্রতিপাদ্যে বন্য প্রাণী রক্ষার কথা বললেই হবে না, তা বাস্তবরূপ চায় পার্বত্যবাসী।

খাগড়াছড়ির পিটাছড়া বন প্রতিষ্ঠাতা ও বন্য প্রাণী সংরক্ষক মাহফুজ আহমেদ রাসেল বলেন, পার্বত্যাঞ্চল তথা খাগড়াছড়ি বন্য প্রাণীর জন্য একটা উপযুক্ত জায়গা। ধরা যায় একপ্রকার অভয়ারণ্য-অভয়াশ্রম। কিন্তু বর্তমান সময়ে পাহাড়ে বিভিন্ন চাষাবাদের নামে গাছ কাটা, ছড়া-নদী ভরাট করা, কঁচু ও কাসাভা চাষ করে টপ সয়েল যেমন নষ্ট করছে ঠিক একইভাবে পরিবেশ নষ্ট করে বন্য প্রাণীর অস্তিত্ব বিলীন করছে। বন্য প্রাণী রক্ষায় সকলের এগিয়ে আসা দরকার।

রাঙামাটি জুম নিয়ন্ত্রণ বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক মো. তবিবুর রহমান বলেন, আমরা বন্য প্রাণী রক্ষায় সবসময়ই কাজ করে আসছি। শিকারীদের কবল থেকে বিভিন্ন প্রাণী জব্দ করে, তা সুস্থ করে উপযুক্ত বনে অবমুক্ত করছি। বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন নিয়ে কাজ করছি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে বাজারের টহল ও প্রচারণা করছি।

এ বিষয়ে রাঙামাটি সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক রাশেদা মমতাজ জানান, বন ও বন্য প্রাণী রক্ষায় দেশের সকল স্থানে সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় শিক্ষার্থীদের ফিল্ড ওয়ার্ক, প্রাকটিক্যাল সহ সরজমিন পরিদর্শন বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে তারা বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হবে।

প্রসঙ্গত, গত ৪ বছরে বন বিভাগ পার্বত্য অঞ্চল থেকে বিপন্ন প্রায় ৩১ প্রজাতির বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও অবমুক্ত করেছে। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাবলাখালী ও কাঁচালং রেঞ্জে এখন পর্যন্ত ১২-১৩টি বন্য হাতির উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে বন বিভাগ।

বন উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস, নির্বিচারে বন্যপ্রাণী শিকার এবং পাচারের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের এই অমূল্য জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস হওয়ার কারণে প্রাণী জগৎ হয়ে পড়ছে কোণঠাসা ও বিপদগ্রস্ত। যা পার্ত্যাঞ্চলের চারণভূমি থেকে বিদায় দিয়ে দিচ্ছে।

বিষয়:

এলাকার খবর

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL