ভোরের নীরবতা ভেঙে হঠাৎ ভেসে এলো মোরগের ডাক। একটু পরেই শোনা গেল কুকুরের ঘেউ ঘেউ। শব্দ এতটাই জীবন্ত যে, আশপাশে থাকা মানুষও একবার ফিরে তাকাতে বাধ্য হন—কোথা থেকে এলো ডাক? সামনে তাকিয়ে দেখা গেল, কোনো মোরগ কিংবা কুকুর নেই। শব্দগুলো আসছে ২২ বছরের এক তরুণের কণ্ঠ থেকে।
তরুণটির নাম জীবন তঞ্চঙ্গা। এক চোখে আংশিক দৃষ্টিশক্তি। ছোটবেলাতেই হারিয়েছেন বাবা-মাকে। নেই নিজের কোনো স্থায়ী ঘরও। আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে কখনো এখানে, কখনো সেখানে কেটে যায় তাঁর দিন। বেশিরভাগ সময় থাকেন খাগড়াছড়িতে। জীবনের এমন প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁর কণ্ঠে লুকিয়ে আছে বিস্ময় জাগানো এক প্রতিভা—মোরগ ও কুকুরের ডাক অবিকল নকল করতে পারেন তিনি।
জীবন যখন মোরগের ডাক দেন, মনে হয় যেন কাছেই কোনো মোরগ ভোরের জানান দিচ্ছে। আবার কুকুরের ঘেউ ঘেউ শুনলে মনে হয়, উঠোনের আড়ালেই বুঝি কোনো কুকুর দাঁড়িয়ে আছে। কয়েক মুহূর্তের এই পরিবেশনা বদলে দেয় চারপাশের আবহ। কেউ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকেন, কেউ হেসে ওঠেন, আবার কেউ হাততালি দিয়ে উৎসাহ দেন তাঁকে।
জীবন বলেন, ছোটবেলা থেকেই মোরগ ও কুকুরের ডাক নকল করতে পারেন তিনি। মানুষের আনন্দ দেখে নিজেরও ভালো লাগে।
জীবনের বাড়ি রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার ফারোয়া ইউনিয়নের শালবাগান পাড়ায়। তবে সেই বাড়ি এখন আর তাঁর নিজের ঠিকানা নয়। ছোটবেলায় বাবা-মাকে হারানোর পর জীবন অনেকটাই ছন্নছাড়া হয়ে পড়েন। এক ভাই ও এক বোন থাকেন ভারতের চেন্নাইয়ে। আর জীবন ঘুরে বেড়ান আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে। এক চোখে আংশিক দেখতে পাওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাপনেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা।
কিন্তু এসব সীমাবদ্ধতা তাঁর কণ্ঠকে থামাতে পারেনি-
নিজের এই অদ্ভুত প্রতিভাকে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই ধরে রেখেছেন জীবন। মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে যখন তিনি মোরগের ডাক কিংবা কুকুরের ডাক নকল করেন, তখন কিছুক্ষণের জন্য যেন তাঁর জীবনের দুঃখ-কষ্টগুলোও আড়ালে চলে যায়। দর্শকদের হাসি, বিস্ময় আর হাততালিই হয়ে ওঠে তাঁর আনন্দের জায়গা।
জীবনের এই প্রতিভার স্বীকৃতির একটি বড় মুহূর্ত এসেছে ভারতের চেন্নাইয়ে। চিকিৎসার জন্য সেখানে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে নিজের কণ্ঠের এই অভিনব প্রতিভা মানুষের সামনে তুলে ধরেন। তাঁর পরিবেশনায় মুগ্ধ হয়ে অনেকেই তাঁকে বকশিশ দেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা পেয়েছিলেন তিনি।
টাকার অঙ্কটি হয়তো খুব বড় নয়। কিন্তু জীবনের কাছে এই অর্থের চেয়েও বড় ছিল মানুষের স্বীকৃতি। কারণ, জীবনের গল্পে প্রাপ্তির চেয়ে না-পাওয়ার তালিকাই দীর্ঘ।
শৈশবেই বাবা-মাকে হারানো, এক চোখে আংশিক দৃষ্টিশক্তি, স্থায়ী ঠিকানা না থাকা—একজন তরুণের এগিয়ে যাওয়ার পথে এসবই বড় বাধা। কিন্তু জীবন সেই বাধাগুলোকে নিজের পরিচয় হতে দেননি। বরং নিজের কণ্ঠের প্রতিভাকে আঁকড়ে ধরেই খুঁজে নিয়েছেন আনন্দের একটি পথ।
জীবনের স্বপ্নও খুব বড় কিছু নয়। নিজের এই প্রতিভার স্বীকৃতি চান তিনি। চান, তাঁর মতো একজন প্রতিভাবান তরুণকে কেউ একটু সুযোগ দিক। একটি মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিভা দেখানোর সুযোগ পেলে হয়তো তাঁর কণ্ঠ পৌঁছে যেতে পারে আরও অনেক মানুষের কাছে।
জীবনের কোনো বড় মঞ্চ নেই। নেই পরিচিতির আলোও। নেই স্থায়ী ঘর কিংবা নিশ্চিন্ত ভবিষ্যৎ। আছে শুধু এক কণ্ঠ—যে কণ্ঠে কখনো ভেসে আসে ভোরের মোরগের ডাক, কখনো শোনা যায় উঠোনের কুকুরের ঘেউ ঘেউ।
দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা তাঁকে থামাতে পারেনি-
জীবনের কঠিন বাস্তবতাও পারেনি তাঁর ভেতরের প্রতিভাকে নিভিয়ে দিতে। তাই যখন জীবন তঞ্চঙ্গার কণ্ঠে মোরগের ডাক ভেসে আসে, কিংবা হঠাৎ শোনা যায় কুকুরের ঘেউ ঘেউ—তখন শুধু মানুষই মুগ্ধ হয় না, কয়েক মুহূর্তের জন্য তাঁর নিজের কষ্টের জীবনটাও যেন হারিয়ে যায় সেই শব্দের আড়ালে।