পাহাড়ের দুর্গম জনপদ, সীমিত সুযোগ, নানা প্রতিকূলতা—এসব পেরিয়েও স্বপ্ন দেখছে খাগড়াছড়ির শিক্ষার্থীরা। কেউ এসেছে প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকা থেকে, কেউবা নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও চালিয়ে গেছে পড়াশোনা। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ–৫ পাওয়ার সাফল্য তাদের কাছে শুধু ফলাফল নয়; বরং দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, পরিবার-শিক্ষকের সহযোগিতা আর ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয়ের প্রতিফলন।
এই স্বপ্ন ও সাফল্যের উদ্যাপনই দেখা গেল খাগড়াছড়িতে ‘শিখো–প্রথম আলো জিপিএ–৫ প্রাপ্ত কৃতি সংবর্ধনা ২০২৬’ অনুষ্ঠানে। রোববার সকালে খাগড়াছড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের হলরুমে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
সংবর্ধনা নিতে আসা শিক্ষার্থীদের কারও চোখে ছিল ভবিষ্যতের বড় স্বপ্ন, কারও কথায় উঠে এসেছে সাফল্যের পেছনের সংগ্রাম। দুর্গম এলাকা থেকে উঠে এসে জিপিএ–৫ পাওয়া কষ্পিকা চাকমা তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলে, ‘আমার বাবা পাহাড়ে জুমচাষ করেন। বাড়ি খাগড়াছড়ির দীঘিনালার দুর্গম এলাকায়। সে এলাকা থেকেই আমি এসেছি। পড়াশোনা করেছি খাগড়াছড়ি প্রধান ডাকঘরে কর্মরত কনিকা চাকমার বাসায় থেকে। এরপর পরীক্ষায় জিপিএ–৫ পেয়েছি। আমার জিপিএ–৫ পাওয়ার এ পথটা সহজ ছিল না।’
তার মতো অনেক শিক্ষার্থীর সাফল্যের পেছনে রয়েছে পরিবার, শিক্ষক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতা। কষ্পিকা জানায়, দুর্গম এলাকা থেকে তাকে নিয়ে এসে পড়াশোনার সুযোগ করে দিয়েছেন কনিকা চাকমা। এ সুযোগের জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সে বলে, ‘এত বড় একটি অনুষ্ঠানে আমাকে সংবর্ধনা দেওয়ায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’
‘স্বপ্ন দেখো, জীবন গড়ো’ স্লোগানে সারা দেশের ৬৪টি জেলায় জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দিচ্ছে প্রথম আলো। শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শিখোর পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত এ কর্মসূচির অংশ হিসেবে খাগড়াছড়িতেও এ সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়।
জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জয়ন্তী দেওয়ান। অনুষ্ঠানে বক্তারা শুধু পরীক্ষার ফলাফল নয়, শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ, মানবিকতা, সৃজনশীলতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের ওপর গুরুত্ব দেন।
লেখক ও গবেষক ঞোলা মং মারমা শিক্ষার্থীদের নিজেদের শিকড় ও পরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা অনেক সময় নিজেদের শিকড়কে ভুলে যাই। তোমাদের নিজেদের শিকড়কে ভুলে গেলে হবে না। মনে রাখতে হবে, আমরা যত বড়ই হই না কেন, আমাদের অস্তিত্বের কথা মনে রাখতে হবে।’
খাগড়াছড়ি সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ পুলক বরণ চাকমা বলেন, ‘তোমাদের আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে হবে। মেধা ও মানবিকতা—দুটির সমন্বয়েই একজন মানুষ তৈরি হয়। তোমাদের প্রকৃত মানুষ হতে হবে।’
শিক্ষার্থীদের বই ও পত্রিকা পড়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘পড়াশোনা হচ্ছে একধরনের মেডিটেশন। প্রথম আলো জীবনকে বদলে দেওয়ার মতো একটি পত্রিকা। কারণ, তারা সবকিছুর ভেতরের বিষয়গুলো তুলে ধরে। প্রকৃত মানুষ হতে হলে তোমাদের আজীবন মা–বাবা, শিক্ষক ও প্রকৃতির কাছে কৃতজ্ঞ থাকতে হবে।’
প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক বিশ্বজিৎ চৌধুরী জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানান। একই সঙ্গে তিনি পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন না করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, যারা জিপিএ–৫ পায়নি, তাদেরও হতাশ হওয়ার কারণ নেই। জীবনে এগিয়ে যেতে আত্মবিশ্বাস, মানবিকতা ও ইতিবাচক মানসিকতা ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে কৃতি শিক্ষার্থীদের হাতে সংবর্ধনা স্মারক ও অন্যান্য উপহার তুলে দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি তাঁদের অভিভাবক ও শিক্ষকেরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অভিভাবকদের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন ফাতেমা খাতুন। তিনি এমন আয়োজনের জন্য প্রথম আলোকে ধন্যবাদ জানান।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বন্ধুসভার সদস্য মনতোষ ত্রিপুরা। সংবর্ধনা শেষে ছিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।
খাগড়াছড়ির মতো পাহাড়ি ও দুর্গম জনপদে শিক্ষার্থীদের সাফল্যের এই আয়োজন তাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়ার পাশাপাশি পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর বার্তাও দিয়েছে। জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের সাফল্য উদ্যাপনের পাশাপাশি অনুষ্ঠানের বক্তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে—ভবিষ্যতের শিক্ষা শুধু ভালো ফলাফলে সীমাবদ্ধ নয়; জ্ঞান, মানবিকতা, প্রকৃতি ও সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ নিয়েই গড়ে উঠতে হবে নতুন প্রজন্মকে।
এবারের আয়োজনের পাওয়ার্ড বাই বিকাশ। সহযোগিতায় রয়েছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা–গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।