শিরোনামঃ

গোল নয়, যেন শিল্পের জাল বুনো তুমি যে ফুটবলের এক সর্বকালের সেরা রাজপুত্র

প্রতিবেদক: শুভ তালুকদার শান
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
লিওনেল আন্দ্রেস মেসির ছবি:
লিওনেল আন্দ্রেস মেসির ছবি:

ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়; এটি কোটি কোটি মানুষের আবেগ, স্বপ্ন ও ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি। আর সেই আবেগের সবচেয়ে উজ্জ্বল নামগুলোর একটি লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। অসংখ্য রেকর্ড, শত শত গোল ও অগণিত শিরোপার মালিক হয়েও তিনি আজও বিনয়ী, পরিবারপ্রেমী এবং অনুপ্রেরণার এক অনন্য উদাহরণ।
লিওনেল আন্দ্রেস মেসির জন্ম ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন আর্জেন্টিনার রোসারিও শহরে। তাঁর বাবা হোর্হে হোরাসিও মেসি ছিলেন একটি স্টিল কারখানার কর্মী এবং স্থানীয় একটি ফুটবল ক্লাবের কোচ। মা সেলিয়া মারিয়া কুচ্চিত্তিনি কর্মজীবী ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে ২০১৭ সালে তিনি শৈশবের বান্ধবী আন্তোনেলা রোকুজ্জোকে বিয়ে করেন। তাঁদের তিন পুত্র—থিয়াগো, মাতেও ও চিরো। মাঠের বাইরের মেসি একজন পারিবারিক মানুষ, পরিবার নিয়েই সময় কাটাতে বেশ ভালোবাসেন- যা তাঁকে ভক্তদের কাছে আরও প্রিয় করে তুলেছে।
ছোটবেলা থেকেই বাবা-মায়ের উৎসাহ ও ত্যাগ মেসির ফুটবল-স্বপ্নকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করায়।
মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই ফুটবলের সঙ্গে তাঁর পথচলা শুরু। কিন্তু অল্প বয়সেই তাঁর শরীরে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি ধরা পড়ে, যা তাঁর ক্যারিয়ারকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়। ঠিক সেই সময় তাঁর প্রতিভাকে মূল্যায়ন করে এফসি বার্সেলোনা তাঁকে স্পেনে নিয়ে যায় এবং চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ করে। সেখান থেকেই শুরু হয় ফুটবল ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।
২০০৪ সালে বার্সেলোনার মূল দলে অভিষেকের মাধ্যমে শুরু হয় তাঁর পেশাদার ক্যারিয়ার। দীর্ঘ ১৭ বছরে তিনি ক্লাবটির ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর নেতৃত্বে বার্সেলোনা জয় করে একের পর এক লা লিগা, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ অসংখ্য শিরোপা। ২০২১ সালে তিনি প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি)-তে যোগ দেন এবং দুই মৌসুম পর ২০২৩ সালে ইন্টার মায়ামিতে নতুন অধ্যায় শুরু করেন।
জাতীয় দলের জার্সিতে তাঁর যাত্রা শুরু হয় ২০০৪ সালে আর্জেন্টিনার অনূর্ধ্ব-২০ দলে। এরপর ১৭ আগস্ট ২০০৫ সালে হাঙ্গেরির বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে সিনিয়র দলে অভিষেক হয়। সেই ম্যাচে মাত্র ৪৭ সেকেন্ডের মধ্যেই লাল কার্ড দেখলেও সেটিই ছিল এক কিংবদন্তির সূচনা। পরবর্তীতে তিনি আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং সর্বাধিক ম্যাচ খেলা ফুটবলার হয়ে ওঠেন।
২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয় তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের বড় অধ্যায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরপর ২০২২ সালে ফিফা বিশ্বকাপ জিতে তিনি দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ করেন এবং নিজের অবস্থানকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরাদের কাতারে আরও দৃঢ় করেন। ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকাতেও তিনি দলকে শিরোপা জয়ে নেতৃত্ব দেন।
মেসি মূলত ফরোয়ার্ড ও প্লেমেকার হিসেবে খেলেন। তাঁর ড্রিবলিং, নিখুঁত পাস, দুর্দান্ত ফ্রি-কিক এবং গোল করার অসাধারণ দক্ষতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। শুধু গোল করাই নয়, সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর ক্ষেত্রেও তিনি সমান দক্ষ।
৮ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত তাঁর অফিসিয়াল ক্যারিয়ার গোলসংখ্যা ৯১৮। এর মধ্যে ক্লাব ফুটবলে ৭৯৪টি এবং আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে ১২৪টি গোল করেছেন।
চলমান ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে তিনি আর্জেন্টিনার জার্সিতে দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন। পাঁচ ম্যাচে তাঁর গোলসংখ্যা আট। ৭ জুলাই মিশরের বিপক্ষে নকআউট পর্বের ম্যাচে তাঁর একটি গোল আর্জেন্টিনার ৩–২ ব্যবধানে জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ২১-এ।
মেসির সবচেয়ে বড় পরিচয় শুধু তাঁর রেকর্ড বা শিরোপা নয়; তাঁর নেতৃত্ব, খেলার সৌন্দর্য এবং মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তাঁকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। খ্যাতির সর্বোচ্চ শিখরে থেকেও তিনি কখনো নিজেকে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নেননি।
ফুটবল ইতিহাসে বহু কিংবদন্তির জন্ম হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। কিন্তু লিওনেল আন্দ্রেস মেসি এমন এক নাম, যিনি শুধু রেকর্ডের পাতায় নন, কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবেন। তিনি কেবল আর্জেন্টিনার গর্ব নন; তিনি বিশ্ব ফুটবলের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার আলো আগামী প্রজন্মকেও অনুপ্রাণিত করবে।

বিষয়:

এলাকার খবর

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL