শিরোনামঃ

পাঠ্যবইয়ের বাইরেও এক জগৎ: অনলাইন আসক্তি বনাম বই পড়ার আনন্দ

প্রতিবেদক: শুভ তালুকদার শান
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি: দৈনিক দেশের কথা
ছবি: দৈনিক দেশের কথা

বই মনের মতো সই—এই কথাটি আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি। সত্যিই তাই। একটি ভালো বই মানুষকে শুধু নতুন তথ্য দেয় না বরং চিন্তা করতে শেখায়, নিজের ভুল শুদ্ধ বিচার করার ক্ষমতা গড়ে তোলে এবং জীবনের নানা বাস্তবতা বুঝতে সাহায্য করে। কিন্তু বর্তমান সময়ে বই বলতে আমরা যেন শুধু পাঠ্যবইকেই বুঝি। পরীক্ষা, ভালো ফল, ভর্তি পরীক্ষা কিংবা চাকরির প্রস্তুতির ব্যস্ততায় একাডেমিক বইয়ের বাইরে অন্য বই পড়ার অভ্যাস দিন দিন কমে যাচ্ছে। অথচ একজন মানুষের প্রকৃত শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
পাঠ্যবই আমাদের নির্দিষ্ট বিষয়ে জ্ঞান দেয়, কিন্তু সিলেবাসের বাইরের বই আমাদের জীবন সম্পর্কে ভাবতে শেখায়। সাহিত্য মানুষের অনুভূতিকে সমৃদ্ধ করে, ইতিহাস অতীত থেকে শিক্ষা নিতে শেখায়, জীবনী সাহস ও অধ্যবসায়ের গল্প শোনায়, বিজ্ঞান কৌতূহল বাড়ায় আর দর্শনের বই যুক্তি দিয়ে চিন্তা করার অভ্যাস তৈরি করে। তাই একজন শিক্ষার্থীর পূর্ণাঙ্গ বিকাশের জন্য একাডেমিক বইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের বই পড়া অত্যন্ত প্রয়োজন। বর্তমান প্রজন্মের একটি বড় অংশ বই থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ছোট ছোট ভিডিও, অনলাইন গেম এবং নানা ধরনের ডিজিটাল বিনোদন তরুণদের অবসর সময়ের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে। প্রযুক্তি অবশ্যই প্রয়োজনীয়, কিন্তু এর অতিরিক্ত ব্যবহার বই পড়ার অভ্যাসকে দুর্বল করে দিচ্ছে।একসময় বিকেলের অবসর মানেই ছিল গল্পের বই, পত্রিকা কিংবা লাইব্রেরিতে সময় কাটানো। এখন অনেকের কাছে অবসর মানেই মোবাইলের পর্দায় চোখ রাখা। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ দিয়ে একটি বই পড়ার ধৈর্য কমে যাচ্ছে। এর প্রভাব শুধু শিক্ষাজীবনে নয়, চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা এবং ব্যক্তিত্বের বিকাশেও পড়ছে। একটি ভালো বই মানুষকে এমনভাবে ভাবতে শেখায়, যা কোনো ছোট ভিডিও বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট পারে না। বই পড়লে মনোযোগ বাড়ে, ভাষা সমৃদ্ধ হয়, বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা তৈরি হয় এবং নিজের মতামত প্রকাশের দক্ষতাও বৃদ্ধি পায়। যারা নিয়মিত বই পড়েন, তারা সাধারণত যেকোনো বিষয় গভীরভাবে বুঝতে এবং যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করতে পারেন।
বিশ্বসাহিত্যের বড় লেখকদের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, জসীমউদ্দীন, সৈয়দ মুজতবা আলী কিংবা হুমায়ূন আহমেদের বই একজন পাঠককে মানুষের জীবন, সমাজ, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। একইভাবে বিভিন্ন বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা, সাহিত্যিক ও রাষ্ট্রনায়কদের জীবনী পড়লে জানা যায়, সাফল্যের পেছনে কত ত্যাগ, পরিশ্রম ও ধৈর্য লুকিয়ে থাকে। এসব বই তরুণদের স্বপ্ন দেখতে শেখায় এবং কঠিন সময়ে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগায়। নিয়মিত বই পড়ার আরেকটি বড় উপকার হলো ভাষার উন্নয়ন। বিভিন্ন ধরনের বই পড়লে শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়, লেখার মান উন্নত হয় এবং সুন্দরভাবে নিজের কথা প্রকাশ করার দক্ষতা তৈরি হয়। একজন ভালো পাঠক সাধারণত ভালো বক্তা ও ভালো লেখকও হন।
শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, সব বয়সের মানুষের জন্যই বই পড়া প্রয়োজন। পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি মানবিক গুণাবলি অর্জনেও বই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বর্তমান চাকরির বাজারেও সিলেবাসের বাইরের জ্ঞানের মূল্য অনেক। মৌখিক পরীক্ষায় সাধারণ জ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমসাময়িক বিশ্ব এবং বিশ্লেষণধর্মী চিন্তার মূল্যায়ন করা হয়। যারা নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের বই পড়েন, তারা এসব ক্ষেত্রে অন্যদের তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে থাকেন। পরিবার থেকেই বই পড়ার অভ্যাস শুরু হওয়া উচিত। বাবা-মা যদি ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে বই উপহার দেন, গল্প পড়ে শোনান কিংবা একসঙ্গে বই নিয়ে আলোচনা করেন, তাহলে শিশুর মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই বইয়ের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়। একইভাবে বিদ্যালয় ও কলেজে পাঠচক্র, বই আলোচনা, লাইব্রেরি কার্যক্রম এবং বই পড়া বিষয়ক বিভিন্ন আয়োজন বাড়ানো প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অমর একুশে বইমেলা শুধু বই কেনাবেচার জায়গা নয়; এটি আমাদের সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার অন্যতম বড় আয়োজন। বইমেলা নতুন লেখক-পাঠকের পরিচয় ঘটায় এবং বই পড়ার আগ্রহ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে বইমেলা ঘিরে শুধু কয়েক দিনের আগ্রহ নয়, সারা বছর বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলাই সবচেয়ে জরুরি।
আজকের সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো অনলাইন আসক্তি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ সময় কাটানো, একের পর এক ছোট ভিডিও দেখা কিংবা অনলাইন গেমে ডুবে থাকা অনেক তরুণের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এসব মাধ্যম তাৎক্ষণিক বিনোদন দিলেও মনোযোগ ধরে রাখা, গভীরভাবে চিন্তা করা এবং ধৈর্য নিয়ে শেখার ক্ষমতাকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেয়। অল্প সময়ের উত্তেজনা শেষ হয়ে গেলেও এর প্রভাব থেকে যায় মনন ও চিন্তার জগতে। অন্যদিকে একটি ভালো বই পাঠককে ধীরে ধীরে একটি নতুন জগতে নিয়ে যায়, যেখানে কল্পনা, অনুভূতি, যুক্তি ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠে পরিণত চিন্তার ভিত্তি। তাই অনলাইন বিনোদনের ক্ষণস্থায়ী আনন্দের তুলনায় বই পড়ার আনন্দ অনেক বেশি গভীর, স্থায়ী এবং জীবন গঠনে কার্যকর।
অনেকেই বলেন, ইন্টারনেটে সব তথ্য পাওয়া যায়, তাই বই পড়ার প্রয়োজন কমে গেছে। বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। ইন্টারনেট দ্রুত তথ্য দেয়, কিন্তু বই সেই তথ্যকে ব্যাখ্যা করে, বিশ্লেষণ করে এবং গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করে। প্রযুক্তি তথ্যের দরজা খুলে দেয়, আর বই সেই তথ্যকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় রূপান্তরিত করে।
প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অংশ হয়ে থাকবে। কিন্তু প্রযুক্তি যেন বইয়ের বিকল্প না হয়ে ওঠে। বরং প্রযুক্তিকে জ্ঞান অর্জনের সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করতে হবে এবং বইকে রাখতে হবে চিন্তা ও মননের ভিত্তি হিসেবে। প্রতিদিন অন্তত আধা ঘণ্টা বই পড়ার অভ্যাস একজন মানুষের জীবনকে ইতিবাচকভাবে বদলে দিতে পারে। স্মার্টফোনের পর্দা আমাদের মুহূর্তের বিনোদন দিতে পারে, কিন্তু একটি ভালো বই আজীবনের চিন্তা, মূল্যবোধ ও প্রেরণার উৎস হয়ে থাকে। তাই প্রতিটি তরুণের হাতে যেমন প্রযুক্তি থাকবে, তেমনি একটি ভালো বইও থাকা উচিত।
একাডেমিক বই আমাদের পেশাগত জীবনের ভিত্তি তৈরি করে, আর পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই আমাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। একটি জ্ঞানভিত্তিক, সচেতন ও মানবিক সমাজ গড়তে হলে বই পড়ার সংস্কৃতি আবারও ফিরিয়ে আনতে হবে। পরীক্ষার খাতা বন্ধ হওয়ার পরও বইয়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক যেন অটুট থাকে। কারণ একটি ভালো বই শুধু জ্ঞান দেয় না, মানুষকে বদলে দেয়, নতুন স্বপ্ন দেখায় এবং জীবনের পথ চলায় আজীবন বিশ্বস্ত সঙ্গী হয়ে থাকে। অনলাইন আসক্তির এই সময়ে বইয়ের প্রতি ভালোবাসাই হতে পারে আত্মগঠন, সৃজনশীলতা এবং মানবিক মূল্যবোধ রক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী পথ।

বিষয়:

এলাকার খবর

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL