শিরোনামঃ

চট্টগ্রাম বন্দরে ‘জিরো আওয়ার’, দুই দিনেই জাহাজ ছাড়ছে

৮–১০ দিনের কাজ নেমেছে দুই দিনে; চট্টগ্রাম-মোংলা বন্দরে রেকর্ড রাজস্ব ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং—সংসদে নৌপরিবহনমন্ত্রী
চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামান  দায়িত্ব নেওয়ার পর সাফল্যের গতি উর্ধ্বমুখী হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরে। যা জাতীয় সংসদে  চট্টগ্রাম বন্দরের সফলতা তুলে ধরলেন নৌপরিবহনমন্ত্রী

মামুনুর রশিদ
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামে পণ্য খালাস ও জাহাজ পরিচালনায় বড় ধরনের গতি এসেছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেছেন, আগে চট্টগ্রাম বন্দরে একটি জাহাজকে পণ্য খালাস ও পুনরায় পণ্য লোডের জন্য ৮ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। বর্তমানে সেই সময় কমে মাত্র দুই দিনে নেমে এসেছে। এমনকি পণ্য খালাসের জন্য জাহাজকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে না—যাকে তিনি ‘জিরো আওয়ার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে চট্টগ্রাম-১৫ আসনের বিরোধী দলের সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে নৌপরিবহনমন্ত্রী দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোর বর্তমান সক্ষমতা, রাজস্ব আয়, কনটেইনার হ্যান্ডলিং এবং বন্দর ব্যবস্থাপনার অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের বার্থ বা ডিপ সিতে অবস্থানরত জাহাজগুলো দুই দিনের মধ্যে পণ্য খালাস এবং পুনরায় পণ্য লোড করে ছেড়ে যেতে পারছে। অতীতে একই কাজে ৮ থেকে ১০ দিন সময় লাগত। তাঁর ভাষায়, এটি বন্দরের কার্যক্রমে একটি রেকর্ড এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।আর এই দৃষ্টান্তের নেপথ্যে নির্ভীক নাবিক এস এম মনিরুজ্জামান।তিনি চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান এর দায়িত্ব নেওয়ার পর সাফল্যের গতি উর্ধ্বমুখী হচ্ছে। যা জাতীয় সংসদে  চট্টগ্রাম বন্দরের সফলতা তুলে ধরলেন নৌপরিবহনমন্ত্রী।
★★বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্যে নতুন গতি
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর। দেশের শিল্পের কাঁচামাল, ভোগ্যপণ্য, জ্বালানি, মূলধনি যন্ত্রপাতি ও রপ্তানি পণ্য পরিবহনের বড় অংশ এ বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে জাহাজের অবস্থানকাল কমে আসা এবং দ্রুত পণ্য খালাস-লোডিংয়ের সক্ষমতা বাড়া সরাসরি দেশের সরবরাহব্যবস্থা ও বাণিজ্য ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও কার্যক্রম বৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরে ৩৫ লাখ ১৮ হাজার ৮৪১ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেশি। একই অর্থবছরে কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে প্রায় ১৩ কোটি ৭৭ লাখ ৪০ হাজার টন।
অর্থাৎ জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড সময় কমানোর পাশাপাশি কনটেইনার ও কার্গো ব্যবস্থাপনাতেও ধারাবাহিক সক্ষমতা বৃদ্ধির চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।
★★রেকর্ড রাজস্ব ও কনটেইনার ওঠানামা
সংসদে নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেন, শুধু চট্টগ্রাম নয়, চট্টগ্রাম ও মোংলা—দুই সমুদ্রবন্দরই বর্তমানে যেকোনো সময়ের তুলনায় রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব আদায় এবং কনটেইনার ওঠানামা করছে।
মন্ত্রী বলেন, “বন্দরগুলি, চিটাগাং বন্দর এবং মংলা বন্দর যেকোনো সময়ের চেয়ে রেকর্ড সংখ্যক তারা রেভিনিউ কালেক্ট করেছে। রেকর্ড সংখ্যক তারা কনটেইনার লোড এবং আনলোড করেছে।”
তাঁর মতে, এসব অগ্রগতি প্রমাণ করে বন্দরের সেবা, দক্ষতা ও কার্যক্ষমতা বাড়ছে।
★★‘জিরো আওয়ার’ কতটা গুরুত্বপূর্ণ
বন্দর ব্যবস্থাপনায় একটি জাহাজ কত দ্রুত বন্দরে প্রবেশ করে পণ্য খালাস ও লোডিং শেষ করে বেরিয়ে যেতে পারে, সেটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাহাজকে দীর্ঘ সময় বন্দরে অবস্থান করতে হলে আমদানি-রপ্তানি ব্যয় বাড়ে, সরবরাহে বিলম্ব হয় এবং ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত খরচের চাপ পড়ে।
এই জায়গায় নৌপরিবহনমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের কার্যক্রম ৮–১০ দিন থেকে দুই দিনে নামিয়ে আনার দাবি বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।
এর আগে বন্দর ব্যবহারকারীদের দ্রুত পণ্য খালাস নিশ্চিত করতে চার দিনের মধ্যে ইয়ার্ড থেকে পণ্য সরানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বন্দর ব্যবহারকারী, ব্যবসায়ী, বন্দর ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে এ নির্দেশ দেন।
★★পতেঙ্গা টার্মিনালে আন্তর্জাতিক মানের পরিচালনা
সংসদে নৌপরিবহনমন্ত্রী আরও জানান, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল আন্তর্জাতিক মানে পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) পদ্ধতিতে উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
লালদিয়া টার্মিনালে প্রায় ৮০ কোটি মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ আসছে বলে জানান তিনি। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৩ হাজার মানুষের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলেও সংসদকে অবহিত করেন।
★★বন্দরের জমি দখলমুক্ত করার ঘোষণা
বন্দর কার্যক্রমের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের জমি অবৈধ দখলমুক্ত করার বিষয়টিও সংসদে উঠে আসে।
শাহজাহান চৌধুরী বন্দরের বিভিন্ন জায়গা অবৈধভাবে লিজ দেওয়া ও দখলের বিষয়টি তুলে ধরে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে নৌপরিবহনমন্ত্রী জানান, কয়েকটি জায়গার লিজ ইতোমধ্যে বাতিল করা হয়েছে। তিনটি জায়গার লিজ বাতিলের পর দুটি জায়গা উদ্ধার করা হয়েছে। অন্য একটি জায়গার বিষয় আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
মন্ত্রী জানান, বন্দরের কিছু জায়গা নিয়ে রেল মন্ত্রণালয় ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে মালিকানা-সংক্রান্ত জটিলতাও রয়েছে। আদালতে থাকা বিষয়গুলো আরবিট্রেশনের মাধ্যমে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের সব জায়গা দখলমুক্ত করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
★★কর্ণফুলীর নাব্যতা রক্ষায় ড্রেজিং
চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম সচল রাখতে কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা ধরে রাখাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন নৌপরিবহনমন্ত্রী। এ জন্য নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও ক্যাপিটাল ড্রেজিং করা হচ্ছে। মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কোনো এককালীন প্রকল্প নয়; সারা বছরই চলমান একটি প্রক্রিয়া।
দেশের অন্যান্য নৌপথ নিয়েও সংসদে তথ্য দেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে সচল রাখা হয়েছে এবং আরও প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার নৌপথে ড্রেজিং কার্যক্রম চলছে।
★★বাণিজ্যিক বিশ্লেষণ: কমছে সময়, বাড়ছে সক্ষমতা—চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়নে
চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের অবস্থানকাল ৮–১০ দিন থেকে দুই দিনে নামিয়ে আনার যে তথ্য নৌপরিবহনমন্ত্রী দিয়েছেন, তা বাস্তবায়ন ও ধারাবাহিকভাবে ধরে রাখা গেলে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। জাহাজ দ্রুত খালাস হলে বন্দরের একই অবকাঠামো দিয়ে বেশি সংখ্যক জাহাজ ও কনটেইনার পরিচালনা সম্ভব হবে। এতে বন্দরের সক্ষমতার ব্যবহার বাড়বে এবং আমদানি-রপ্তানি সরবরাহ ব্যবস্থায় সময় সাশ্রয় হতে পারে।
তবে বন্দরের কার্যকারিতা শুধু জাহাজ দ্রুত খালাসের ওপর নির্ভর করে না। কাস্টমস, স্ক্যানিং, ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনা, ডেলিভারি ব্যবস্থা, সড়ক ও রেল যোগাযোগ, ডিপো এবং বন্দর ব্যবহারকারীদের সমন্বিত কার্যক্রমও একই গতিতে পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। ফেব্রুয়ারিতে বন্দর ব্যবহারকারীদের সঙ্গে বৈঠকে স্ক্যানিং মেশিন অচল থাকা এবং পণ্যজটের বিষয়টি উঠে এসেছিল।
ফলে ‘জিরো আওয়ার’ বা দুই দিনের টার্নঅ্যারাউন্ডের সাফল্য শুধু বন্দরের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ না রেখে পুরো লজিস্টিকস চেইনে কার্যকর করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষ করে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় অংশ চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি দেশের শিল্প উৎপাদন, আমদানি ব্যয়, রপ্তানি প্রতিযোগিতা এবং সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
নৌপরিবহনমন্ত্রীর সংসদীয় বক্তব্যে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের রেকর্ড রাজস্ব, রেকর্ড কনটেইনার হ্যান্ডলিং এবং চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসার যে চিত্র উঠে এসেছে, তা দেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে।
জাতীয় সংসদে নৌপরিবহনমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরে যে ৮–১০ দিনের অপেক্ষার যুগ থেকে দুই দিনের টার্নঅ্যারাউন্ডের দিকে অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে—বাংলাদেশের বাণিজ্যিক অর্থনীতির জন্য সেটিই এখন সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার জায়গা।

বিষয়:

এলাকার খবর

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL