ভক্তের প্রয়োজনে, জাগে মা বুড়া কালী, ভক্তের টানে বরাভয় হাতে, নেন যে ভক্তির ডালি।কালের আঁধারে আলো ছড়াও, মাগো তুমি চিরকাল,তোমার চরণে আশ্রয় পেলে, কেটে যায় সব জঞ্জাল।
চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ধলঘাট গ্রামে অবস্থিত শ্রী শ্রী বুড়াকালী মন্দির দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ সনাতনী তীর্থস্থান। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই মন্দিরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ধর্মীয় বিশ্বাস, লোককাহিনি, আধ্যাত্মিক সাধনা এবং ঐতিহ্যের এক সমৃদ্ধ ইতিহাস। স্থানীয়দের মতে, প্রায় পাঁচ শতাধিক বছরের পুরোনো এই মন্দির আজও অসংখ্য ভক্তের অগাধ আস্থার কেন্দ্রবিন্দু।
মন্দিরের প্রতিষ্ঠা নিয়ে স্থানীয়ভাবে একটি সুপ্রচলিত জনশ্রুতি রয়েছে। সেই জনশ্রুতি অনুযায়ী, তৎকালীন রাজারাম দত্ত তীর্থভ্রমণের সময় ধলঘাটে এসে বসতি স্থাপন করেন। এক রাতে দেবী কালী তাঁকে স্বপ্নে দর্শন দিয়ে জানান যে, তিনি একটি নিমগাছের মধ্যে অধিষ্ঠিত রয়েছেন। পরদিন স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী রাজারাম দত্ত সেই নিমগাছের নিচে সাধনায় নিমগ্ন হন। পরবর্তীতে দেবীর নির্দেশে ওই নিমগাছের কাঠ দিয়ে দেবীমূর্তি নির্মাণ করে সেখানে প্রতিষ্ঠা করা হয়। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, বর্তমান মন্দিরটি সেই পবিত্র স্থানেই নির্মিত হয়েছে এবং দেবী তখন থেকেই ‘মা বুড়াকালী’ নামে পূজিত হয়ে আসছেন।
প্রাচীনকাল থেকেই নিমগাছকে রোগ-প্রতিরোধ ও আরোগ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হতো। লোকবিশ্বাস রয়েছে, সেই কারণেই দেবীর বিগ্রহ নির্মাণে নিমকাঠ ব্যবহার করা হয়েছিল। এই বিশ্বাসকে ঘিরেই স্থানীয়ভাবে একটি প্রবাদও প্রচলিত,:
“যে কাঠে বাঁচে মানুষের প্রাণ, সেই কাঠ দিয়েই প্রতিষ্ঠা হবে দেবীর প্রাণ।”
এই সাধনপীঠ শুধু পূজার স্থান নয়; বহু সাধক-সন্ন্যাসীর সাধনা ও আধ্যাত্মিক চর্চার স্মৃতিবিজড়িত এক ঐতিহাসিক তীর্থক্ষেত্রও বটে। জনশ্রুতি অনুসারে, সাধু তারাচরণ পরমহংসদেব, হিন্দিভাষী নাগা সন্ন্যাসী শ্রীমৎ স্বামী ওঙ্কার গিরি মহারাজ এবং তাঁর দীক্ষাপ্রাপ্ত নারায়ণ গিরি মহারাজ এখানে সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। মন্দির প্রাঙ্গণের পাশেই ওঙ্কার গিরি মহারাজের সমাধিস্থল অবস্থিত, যা আজও ভক্তদের কাছে শ্রদ্ধার স্থান।
ভক্তদের দৃঢ় বিশ্বাস, মা বুড়াকালী অত্যন্ত জাগ্রত দেবী। জীবনের নানা সংকট, রোগ-ব্যাধি, পারিবারিক সমস্যা কিংবা মনোস্কামনা পূরণের আশায় প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত ভক্ত এখানে পূজা, প্রার্থনা ও মানত করতে আসেন। মানত পূরণ হলে অনেকে পাঁঠা বলি, বিশেষ ভোগ নিবেদন কিংবা জোড়া কবুতর উড়িয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এসব সম্পূর্ণ ভক্তদের ব্যক্তিগত মানত ও ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর নির্ভরশীল।
প্রতি মঙ্গলবার, শুক্রবার ও শনিবার মন্দিরে ভক্তদের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। এছাড়া অমাবস্যা তিথিতেও বিশেষ পূজা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তবে বছরের সবচেয়ে বড় আয়োজন অনুষ্ঠিত হয় কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে কালীপূজাকে কেন্দ্র করে। এ সময় হাজার হাজার ভক্ত ও দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো মন্দির প্রাঙ্গণ। বসে বর্ণিল মেলা; খেলনা, মিষ্টি, হস্তশিল্প ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অসংখ্য দোকানে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এই উৎসব সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও মিলনমেলার এক অনন্য দৃষ্টান্তে পরিণত হয়।
সময়োপযোগী উন্নয়নের ধারায় স্থানীয় ভক্ত, শুভানুধ্যায়ী ও মন্দির পরিচালনা কমিটির উদ্যোগে মন্দিরের অবকাঠামোতেও এসেছে পরিবর্তন। দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে নির্মিত হয়েছে ভোগ-ঘরসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় স্থাপনা। মন্দির কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, ভবিষ্যতে তীর্থযাত্রীদের সেবা এবং মন্দিরের পরিবেশ আরও উন্নত করতে বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ধলঘাটের শ্রী শ্রী বুড়াকালী মন্দির আজ শুধু একটি উপাসনালয় নয়; এটি চট্টগ্রামের প্রাচীন সনাতনী ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিক সাধনা, লোকবিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের এক উজ্জ্বল প্রতীক। যুগের পর যুগ ধরে এই পবিত্র তীর্থক্ষেত্র ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক সম্প্রীতি এবং মানবকল্যাণের বার্তা বহন করে চলেছে। ভক্তদের বিশ্বাস, মায়ের আশীর্বাদে এই পুণ্যভূমি ভবিষ্যতেও শান্তি, কল্যাণ ও ভক্তির আলোকবর্তিকা হয়ে মানুষের হৃদয়ে চিরজাগরুক থাকবে।