টানা পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং বেড়িবাঁধ ভেঙে সৃষ্ট বন্যায় কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলায় মানবিক সংকট দিন দিন গভীর হচ্ছে। উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন ও পৌরসভার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও মাছের ঘের পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন দুর্গত মানুষ। তবে দুর্যোগের কয়েকদিন পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ বানবাসী মানুষের কাছে এখনো পর্যাপ্ত সরকারি কিংবা বেসরকারি ত্রাণ সহায়তা পৌঁছেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার সদর ইউনিয়নের পূর্ব মেহেরনামা এলাকায় দুই স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে মাতামুহুরী নদীর পানি হু হু করে লোকালয়ে প্রবেশ করে। এতে পেকুয়া পৌরসভাসহ বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। অনেক পরিবারের রান্নাঘরে পানি ঢুকে পড়ায় কয়েকদিন ধরে চুলায় আগুন জ্বলেনি। বিশুদ্ধ পানি, শুকনা খাবার, শিশুখাদ্য ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটে পড়েছেন হাজারো পরিবার। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে বহু সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও মাছের ঘের। বন্ধ হয়ে গেছে স্বাভাবিক কর্মসংস্থান। দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্নআয়ের মানুষেরা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অনেক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি কিংবা উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে।
দুর্গত মানুষের অভিযোগ, এখনো পর্যন্ত অধিকাংশ এলাকায় পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা পৌঁছেনি। জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দল কিংবা মানবিক সংগঠনগুলোর দৃশ্যমান তৎপরতা না থাকায় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে।
পেকুয়া সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি এম বাহাদুর শাহ বলেন, পেকুয়া পৌরসভা ও মেহেরনামা এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অন্তত ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে হরিণাফাঁড়ি এলাকায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সীমিত পরিসরে শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। তবে ইউনিয়ন পরিষদ কিংবা বিএনপির পক্ষ থেকে এখনো ত্রাণ কার্যক্রম শুরু হয়নি।
শিলখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল হোসেন বলেন, তার ইউনিয়নে বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রায় ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। একজন গুরুতর আহত হয়েছেন এবং বহু ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সরকারি বা বেসরকারি কোনো সহায়তা এখনো সেখানে পৌঁছেনি। আশ্রয় কেন্দ্রে মানুষ না থাকায় ত্রানসামগ্রী দেয়া হয়নি।
বারবাকিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাওলানা বদিউল আলম বলেন, তার ইউনিয়নের প্রায় তিন হাজার মানুষ বর্তমানে পানিবন্দি রয়েছেন। এর মধ্যে মাত্র ১০টি পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে গেছে। ইউএনও স্যার বলেছেন, আশ্রায় কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোকে খাদ্য সামগ্রী দিতে। তবে এখন পর্যন্ত সরকারি কিংবা বেসরকারিভাবে কোনো সহায়তা সেখানে পৌঁছেনি।
পেকুয়া উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা ইমতিয়াজ উদ্দিন বলেন, সংগঠনের পক্ষ থেকে শিলখালী ইউনিয়নের ২৫০টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া রাজাখালী ইউনিয়নেও ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নেও সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে।
রাজাখালী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য গোলাম রহমান বলেন, তার ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। অধিকাংশ পরিবার এখনো কোনো ত্রাণ সহায়তা পায়নি। তবে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছে। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে আমরা সব জায়গায় তদারকি করছি।
মগনামা ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবদুর রাজ্জাক বলেন, তার ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। কেউ এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে যাননি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যদের দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশনা দিয়েছেন। তবে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সহায়তা দেওয়া হয়নি।
টইটং ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবদুল আলিম বলেন, তার ইউনিয়নের প্রায় তিন হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। কোনো পরিবার এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে যায়নি। তবে আশ্রয়কেন্দ্রে কেউ এলে তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা রাখতে নির্দেশনা রয়েছে।
অন্যদিকে, উজানটিয়া ইউনিয়নের এক ইউপি সদস্য জানান, সেখানে চার হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এখন পর্যন্ত ওই ইউনিয়নেও কোনো ত্রাণ সহায়তা পৌঁছেনি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধ মেরামতের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। পানিবন্দি মানুষের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে প্রশাসনের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। তিনি জানান, বিভিন্ন ইউনিয়নে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং দ্রুত তাদের মাঝে শুকনা খাবারসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা বিতরণ করা হবে।
এদিকে স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ও ব্যাপক পরিসরে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু না হলে পেকুয়ায় মানবিক সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। তারা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দল ও সমাজের বিত্তবানদের দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।