দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের আঞ্চলিক মেরিটাইম হাব এবং বৈশ্বিক ট্রানজিট কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে বিশ্বমানের প্রযুক্তিগত অংশীদার ও বিদেশি বিনিয়োগকে বাংলাদেশ স্বাগত জানায় বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান।
তিনি বলেন, "চট্টগ্রাম বন্দরকে শুধু বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবেই নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক মেরিটাইম হাব হিসেবে গড়ে তোলাই সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা ও বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।"
সোমবার (২৭ জুলাই) বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ পোর্ট টার্মিনাল অপারেটর কিউটার্মিনালস (QTerminals)-এর গ্রুপ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (গ্রুপ সিইও) মার্কো নিলসেন-এর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শনে এলে বন্দর চেয়ারম্যানের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।
বৈঠকে চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন, পরিচালন সক্ষমতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি সংযোজন, বৈদেশিক বিনিয়োগ, লজিস্টিকস উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
★★চট্টগ্রাম বন্দরের ভূমিকার প্রশংসা:
বৈঠকের শুরুতে কিউটার্মিনালসের প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় পুরো অংশ পরিচালনায় চট্টগ্রাম বন্দরের অবদান অপরিসীম। জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের ধারাবাহিক অগ্রগতিতে এই বন্দর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মোকাবিলায় বন্দরের অপারেশনাল সক্ষমতা ধারাবাহিকভাবে বাড়ানো হচ্ছে। কন্টেইনার জট কমানো, জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম হ্রাস, বড় আকারের কন্টেইনারবাহী জাহাজ সরাসরি ভিড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি এবং আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলার কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।
★★আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে জোর:
চেয়ারম্যান আরও বলেন, বিশ্বমানের প্রযুক্তি ছাড়া একটি আধুনিক বন্দর পরিচালনা সম্ভব নয়। সে কারণে বন্দরে ডিজিটালাইজেশন, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা, স্মার্ট অপারেশন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হচ্ছে।
তিনি জানান, প্রযুক্তিনির্ভর বন্দর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পণ্য খালাসের সময় কমানো, ব্যয় হ্রাস, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাই এখন প্রধান লক্ষ্য।
বিনিয়োগে আগ্রহ কিউটার্মিনালসের
বৈঠকে কিউটার্মিনালসের গ্রুপ সিইও মার্কো নিলসেন বলেন, বিশ্বব্যাপী পোর্ট টার্মিনাল পরিচালনা, কন্টেইনার ব্যবস্থাপনা এবং মেরিটাইম লজিস্টিকসে তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
তিনি চট্টগ্রাম বন্দরের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিচালন কার্যক্রমে অর্জিত অগ্রগতির প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতি এবং চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়। বন্দরের আধুনিকায়নে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং ভবিষ্যতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে কিউটার্মিনালস ইতিবাচকভাবে কাজ করতে আগ্রহী।
সরেজমিনে অপারেশন পরিদর্শন ও
বৈঠক শেষে প্রতিনিধিদল চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান জেটি, কন্টেইনার ইয়ার্ড, বিভিন্ন অপারেশনাল ইউনিট এবং ডিজিটাল সেবা কার্যক্রম পরিদর্শন করেন।
এ সময় তারা পোর্ট কমিউনিটি সিস্টেম (PCS), সিপিএ স্কাই (CPA Sky), আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম ঘুরে দেখেন।
প্রযুক্তিনির্ভর এসব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বন্দরের কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ, দ্রুত ও দক্ষ হয়েছে বলে সন্তোষ প্রকাশ করেন প্রতিনিধিদলের সদস্যরা।
সহযোগিতা আরও জোরদারে সম্মতি
সফরের শেষ পর্যায়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এবং কিউটার্মিনালসের গ্রুপ সিইও মার্কো নিলসেন পারস্পরিক শুভেচ্ছা স্মারক বিনিময় করেন।
এ সময় উভয় পক্ষ ভবিষ্যতে কারিগরি মূল্যায়ন, তথ্য ও অভিজ্ঞতা বিনিময়, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, সম্ভাব্য বিনিয়োগ এবং যৌথ উন্নয়ন কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করতে নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রাখার বিষয়ে একমত হন।
নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ পোর্ট টার্মিনাল অপারেটরের এই উচ্চপর্যায়ের সফর চট্টগ্রাম বন্দরের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, সক্ষমতা এবং বিনিয়োগ সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করবে।
একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশের বন্দর ও লজিস্টিকস খাত নতুন গতি পাবে। এর ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে দেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং জাতীয় অর্থনীতির টেকসই প্রবৃদ্ধিতে চট্টগ্রাম বন্দর আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।