শিরোনামঃ

জন্মাষ্টমী: কৃষ্ণের জন্মতিথিতে সত্য ও মানবতার সন্ধান

প্রতিবেদক: শুভ তালুকদার শান

শুভ তালুকদার শান
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

ভাদ্র মাস এলেই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে উৎসবের আবহ তৈরি হয়। মন্দিরে মন্দিরে শুরু হয় নামসংকীর্তন, গীতাপাঠ, পূজা-অর্চনা ও নানা আয়োজন। ভক্তদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় কৃষ্ণনাম। এরই মধ্যে আসে শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী—ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি। জন্মাষ্টমী সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র একটি দিন। তবে আমার কাছে এই দিনটির গুরুত্ব শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কৃষ্ণের জন্মকাহিনি এবং তাঁর জীবনদর্শনের দিকে তাকালে মনে হয়, বহু বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর কিছু শিক্ষা আজকের মানুষকেও নতুন করে ভাবতে শেখায়।
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দ্বাপর যুগে মথুরার রাজা কংসের অত্যাচারে মানুষ যখন অতিষ্ঠ, তখন দেবকী ও বাসুদেবের সন্তান হিসেবে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে। ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথির গভীর রাতে তাঁর জন্ম। চারপাশে যখন অন্ধকার, তখনই জন্ম নেন কৃষ্ণ। জন্মের পর বাসুদেব তাঁকে নিয়ে যমুনা পেরিয়ে গোকুলে নন্দ ও যশোদার কাছে রেখে আসেন। এরপর কৃষ্ণের শৈশব, কৈশোর, মথুরায় ফিরে আসা এবং কংসবধের কাহিনি মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। কিন্তু কৃষ্ণকে শুধু একটি পৌরাণিক চরিত্র হিসেবে দেখলে তাঁর জীবনদর্শনের অনেক কিছুই হয়তো আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে অর্জুন যখন নিজের স্বজনদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার প্রশ্নে দ্বিধায় পড়ে যান, তখন কৃষ্ণ তাঁকে কর্তব্য ও কর্মের পথ দেখান। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় কৃষ্ণের সেই কথোপকথন আজও মানুষের জীবনের নানা সংকটের সঙ্গে মিলে যায়। আমরাও তো প্রতিদিন নানা সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়াই। কী করব, কোন পথে যাব, ব্যর্থ হলে কী হবে—এসব প্রশ্ন আমাদের ভেতরেও কাজ করে। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন সাফল্যকে অনেক সময় জীবনের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়, তখন কৃষ্ণের কর্মের প্রতি নিষ্ঠার শিক্ষা আমাদের একটু থামতে শেখায়। নিজের কাজটি আন্তরিকভাবে করে যাওয়াই মানুষের হাতে; সব ফল নিজের ইচ্ছামতো পাওয়া যায় না।
কৃষ্ণের দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আত্মসংযম। মানুষের সবচেয়ে কঠিন লড়াই অনেক সময় অন্য কারও সঙ্গে নয়, নিজের সঙ্গেই। রাগ, লোভ, অহংকার, হিংসা কিংবা অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে বাইরের সাফল্যও অনেক সময় মানুষকে শান্তি দিতে পারে না। আবার কৃষ্ণের বৃন্দাবনের জীবন আমাদের সামনে ভিন্ন এক ছবি তুলে ধরে। সেখানে আছে আনন্দ, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা ও মানুষের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের গল্প। কৃষ্ণকে ঘিরে রচিত অসংখ্য পদ, গান, কীর্তন ও লোককথা বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। তাই কৃষ্ণের উপস্থিতি শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গেও তাঁর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
বাংলাদেশেও দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আবহে জন্মাষ্টমী পালিত হয়ে আসছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মন্দিরে আয়োজন করা হয় পূজা, প্রার্থনা, কীর্তন, গীতাপাঠ ও আলোচনা সভার। ঢাকার ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরকে ঘিরে জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রাও দেশের পরিচিত ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক আয়োজনগুলোর একটি। তবে জন্মাষ্টমীর সবচেয়ে সুন্দর দিকগুলোর একটি আমার কাছে সম্প্রীতি। বাংলাদেশ নানা ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের দেশ। প্রত্যেকে নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার পালন করবে, একই সঙ্গে অন্যের বিশ্বাস ও উৎসবের প্রতিও সম্মান দেখাবে—এটাই একটি সুন্দর সমাজের ভিত্তি। কারণ উৎসবের আনন্দ শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয় নয়। অন্যের আনন্দকে সম্মান করতে পারাও মানবিকতার অংশ। আজ আমরা প্রযুক্তির দিক থেকে অনেক এগিয়ে গেছি। মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষের সঙ্গে অন্য প্রান্তের মানুষের যোগাযোগ সম্ভব। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এত যোগাযোগের মধ্যেও মানুষের মধ্যে দূরত্ব যেন অনেক সময় বাড়ছে। সামান্য মতের অমিল থেকেই তৈরি হচ্ছে তর্ক, রাগ, বিদ্বেষ ও বিভাজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করেও মানুষ একে অন্যের প্রতি অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। এই জায়গায় দাঁড়িয়ে কৃষ্ণের শিক্ষা আমাদের কিছু প্রশ্নের সামনে নিয়ে আসে।
আমরা কি অন্যায় দেখলে তার প্রতিবাদ করতে পারি? নিজের স্বার্থের বাইরে গিয়ে অন্যের কথা ভাবতে পারি? ক্ষমতা বা সুযোগ পেলে সেটিকে অন্যকে দমিয়ে রাখার জন্য নয়, বরং ন্যায়ের কাজে ব্যবহার করতে পারি? সবচেয়ে বড় কথা, নিজের ভেতরের দুর্বলতা ও অন্ধকারের সঙ্গে লড়াই করার সাহস কি আমাদের আছে? জন্মাষ্টমী হয়তো এসব প্রশ্ন নিয়ে ভাবারও একটি সুযোগ। মন্দিরে প্রদীপ জ্বালানো সহজ। কিন্তু নিজের ভেতরের অন্ধকার দূর করা কঠিন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা কঠিন। নিজের ভুল স্বীকার করাও কঠিন। আবার কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোও সবসময় সহজ নয়। তবু একজন মানুষের সত্যিকারের পরিচয় হয়তো এখানেই।
কৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল অন্ধকার রাতে। ধর্মীয় বিশ্বাসে সেই অন্ধকার ছিল অন্যায় ও অধর্মের প্রতীক। আর তাঁর আবির্ভাব ছিল সত্য ও ন্যায়ের প্রত্যাশার প্রতীক। আজকের পৃথিবীতেও অন্ধকার আছে। শুধু তার রূপ বদলেছে। কোথাও হিংসা, কোথাও অন্যায়, কোথাও বৈষম্য, কোথাও আবার মানুষের প্রতি মানুষের অবহেলা। এই অন্ধকার দূর করার দায়িত্ব শুধু কোনো একজনের নয়। প্রত্যেক মানুষের নিজের জায়গা থেকে কিছু করার আছে। একটি অন্যায়ের প্রতিবাদ, একটি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, কাউকে অপমান না করা কিংবা নিজের ভুলটি স্বীকার করা—ছোট মনে হলেও এসব কাজই সমাজকে একটু একটু করে বদলায়। তাই জন্মাষ্টমীতে আমাদের প্রার্থনা শুধু নিজের ভালো থাকার জন্য না হোক। প্রার্থনা হোক—আমরা যেন অন্যায় দেখেও নীরব না থাকি, মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা না করি এবং নিজের স্বার্থের কাছে বিবেককে হারিয়ে না ফেলি। কৃষ্ণের জন্মতিথির আলো যেন শুধু মন্দিরের প্রদীপেই না জ্বলে—জ্বলে উঠুক আমাদের মনেও। সত্যের পথে চলার সাহস, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসাই হোক এবারের জন্মাষ্টমীর সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

বিষয়:

এলাকার খবর

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL