চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার উদ্যোগকে কেন্দ্র করে আন্দোলন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি ইজারা বা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল না হলে বন্দর অচল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বন্দর রক্ষা কমিটি ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। আন্দোলনকারীরা ঘোষণা দিয়েছেন—আগামী ৭ অক্টোবর মশাল মিছিল, ১৩ অক্টোবর বন্দর ভবন ও চেয়ারম্যানের কার্যালয় ঘেরাও এবং পরবর্তী ধাপে ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করা হবে।
আন্দোলনকারীদের এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের পণ্য ওঠানামা ও খালাস কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে কনটেইনার জট, জাহাজের পণ্য খালাসে বিলম্ব, শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহে ধাক্কা এবং রপ্তানি পণ্য পরিবহনে জটিলতা তৈরি হলে এর প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে। ফলে এনসিটি-সিসিটি ইস্যু এখন কেবল শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি জাতীয় অর্থনীতি ও সরবরাহব্যবস্থার জন্যও বড় ঝুঁকির প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
★★‘চুক্তি হলেই বন্দর বন্ধ’
সোমবার বেলা ১১টা ২০ মিনিটে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রশাসনিক ভবনের বাইরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন বন্দরকেন্দ্রিক বিভিন্ন শ্রমিক-কর্মচারী সংগঠনের নেতারা। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটির আয়োজনে অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, শ্রমিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা অংশ নেন।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বলেন, ৮ অক্টোবর ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি ইজারা দেওয়ার বিষয়ে চুক্তি হতে পারে বলে তারা জানতে পেরেছেন। চুক্তি হলে সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর বন্ধ করে দেওয়ার কর্মসূচি দেওয়া হবে।
তিনি সরকারের প্রতি সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
বন্দর রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব ফজলুল কবির মিন্টু বলেন, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো চ্যালেঞ্জের সময়ে এনসিটি ও সিসিটির মতো কৌশলগত অবকাঠামো দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা সরকারকে জনগণের কাছে ব্যাখ্যা করতে হবে।
★★১৩ অক্টোবর চেয়ারম্যানের কার্যালয় ঘেরাও
আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আগামী ৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টায় বন্দর ভবনের সামনে থেকে মশাল মিছিল বের করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এরপর ১৩ অক্টোবর বন্দর ভবন ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের কার্যালয় ঘেরাও করার কর্মসূচি রয়েছে।
ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের (টিইউসি) সভাপতি তপন দত্ত বলেন, ১৩ অক্টোবর বন্দর চেয়ারম্যানের কার্যালয় ঘেরাও করা হবে এবং চেয়ারম্যানকে কার্যালয় থেকে বের হতে দেওয়া হবে না।
আন্দোলনকারীরা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের পদত্যাগের দাবিও জানিয়েছেন।
★★২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতির হুঁশিয়ারি
আন্দোলনকারীদের দাবি, এনসিটি ও সিসিটি বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়া হলে দেশের কৌশলগত অবকাঠামোর ওপর বিদেশি নিয়ন্ত্রণ বাড়বে এবং বন্দর থেকে অর্জিত অর্থের বড় অংশ দেশের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। তাদের মতে, দেশীয় জনবল ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা কাজে লাগিয়েই টার্মিনাল পরিচালনা করা সম্ভব।
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শ ম জামাল উদ্দিন বলেন, বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হলে তারা নামমাত্র কর দিয়ে বড় অংশের অর্থ নিয়ে যেতে পারে। দেশীয় জনবল দিয়ে বন্দর পরিচালনা করলে আয় দেশের অর্থনীতিতেই থাকবে।
ডক শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিম বলেন, বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরকার সরে না এলে তারা আরও কঠোর কর্মসূচিতে যাবেন।
★★বন্দর অচল হলে ধাক্কা খেতে পারে অর্থনীতি
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। দেশের শিল্পকারখানার কাঁচামাল, জ্বালানি, ভোগ্যপণ্যসহ বিভিন্ন আমদানি পণ্য যেমন এই বন্দর দিয়ে আসে, তেমনি তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানি পণ্যও এখান দিয়ে বিদেশে যায়।
ফলে বন্দরের কার্যক্রম দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে এর প্রভাব শুধু বন্দর এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। জাহাজে পণ্য ওঠানামায় বিলম্ব, কনটেইনারের স্তূপ তৈরি, ডেলিভারি জট, আমদানি পণ্য খালাসে বিলম্ব এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে পুরো সরবরাহব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এতে শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাজারে পণ্যের সরবরাহ ও দামের ওপরও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি দীর্ঘায়িত হলে বন্দরে জাহাজের জট ও কনটেইনার জট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
★★শ্রমিকদের আরও যেসব দাবি
এনসিটি ও সিসিটি বিদেশি ইজারা বন্ধের পাশাপাশি দেশীয় জনবল ও ব্যবস্থাপনায় বন্দর পরিচালনা, আন্দোলনরত শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার এবং বর্তমান বন্দর চেয়ারম্যানকে প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
কর্মসূচিতে বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি এস কে খোদা তোতন, ডক শ্রমিক দলের সভাপতি মো. হারুন, সিপিবি চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি অশোক সাহা, বাসদ মার্ক্সবাদী চট্টগ্রাম জেলার সমন্বয়ক শফিউদ্দিন কবির আবিদ, গণমুক্তি ইউনিয়নের সমন্বয়ক রাজা মিয়াসহ বিভিন্ন শ্রমিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
★★এখন সরকারের সিদ্ধান্তের দিকে নজর
এনসিটি-সিসিটি নিয়ে একদিকে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের উদ্যোগ, অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠনগুলোর লাগাতার কর্মসূচি—দুই পক্ষের অবস্থান ক্রমেই মুখোমুখি হচ্ছে। এর মধ্যে ৭ অক্টোবরের মশাল মিছিল ও ১৩ অক্টোবরের ঘেরাও কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আন্দোলনকারীদের ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি বাস্তবায়িত হলে তার প্রভাব কতটা হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ চট্টগ্রাম বন্দরে সাময়িক অচলাবস্থাও আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। আর কর্মসূচি দীর্ঘায়িত হলে বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে ধাক্কা থেকে জাতীয় অর্থনীতিতেও বড় ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।