শিরোনামঃ

বিএনপির দুঃসময় রাজনীতি করায়  ক্রসফায়ারে পা বিচ্ছিন্ন হওয়া সাইফুল এখন চক্ষুশূল!

সাবেট
ক্রসফায়ারের ক্ষত, ১৭ বছরের রাজনৈতিক লড়াই, মামলা-জেল-জুলুম—সব পেরিয়ে আজও রাজপথে সাবেক ছাত্রদল নেতা; পা হারানোর পরও হার মানেননি, শুধু প্রশ্ন—বেঁচে থাকতেই কি মিলবে ত্যাগের স্বীকৃতি?

আলী আশরাফ
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:


বিএনপির দুঃসময় রাজনীতি করায়  ক্রসফায়ারে পা বিচ্ছিন্ন হওয়া ছাত্রদলের সাবেক সহ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম সাইফ। তৎকালীন সময়ে সন্ত্রাসী তকমা দিয়ে তাঁর একটি পা বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ভিক্ষার থালা হাতে ধরিয়ে দিতে প্রাণপণ চেষ্টা চালাই। একের পর এক মামলা হামলা জেল জুলুম এক কথায় নির্যাতনের শেষ নেই।তখনকার সময়ে বিএনপির রাজনীতি করার মতো নেতা কর্মি পাওয়া কঠিন ছিলো। প্রায় সবাই যে যার মতো অবস্থানে ছিলেন।চট্টগ্রাম নগরীর ৭ নং ওয়ার্ডে সাইফুল ইসলাম সাইফ মিটিং মিছিল করতেই থাকতো।তাকে কোন মতে দমাতে না পেরে সন্ত্রাসী তকমা দিয়ে তৎকালীন ক্রসফায়ার দিয়ে শরীর থেকে বাম বিচ্ছিন্ন করে দেন।
কখনো কখনো একটি গুলির শব্দ শুধু একজন মানুষের শরীরকে বিদ্ধ করে না—বদলে দেয় তার পুরো জীবন। বদলে যায় হাঁটার ভঙ্গি, বদলে যায় স্বপ্ন, বদলে যায় ভবিষ্যতের হিসাব। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যাদের শরীরের একটি অংশ থেমে গেলেও স্বপ্ন থামে না, বিশ্বাস থামে না, পথচলা থামে না।সাইফুল ইসলাম সাইফ তেমনই একজন।একটি পা হারিয়েছেন। কিন্তু রাজনীতি ছাড়েননি।মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছেন। কারাগারে গেছেন। নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন।নির্যাতিত হয়েছেন।জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময় পার করেছেন। তবুও রাজপথ থেকে সরে দাঁড়াননি।
আজও মিছিলের সামনে দেখা যায় তাঁকে। এক পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে নেতাকর্মীদের সঙ্গে স্লোগান ধরেন। কর্মসূচিতে যান। মানুষের খোঁজ নেন। রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়ান।কিন্তু তাঁর গল্পের সবচেয়ে কষ্টের জায়গাটি সম্ভবত এখানেই—যে মানুষটি দলের দুঃসময়ে নিজের পা হারালেন, দলের সুসময়ে তাঁর প্রাপ্তি কোথায়?আরও বড় প্রশ্ন—সাইফের জনপ্রিয়তা কি এখন কারও কারও কাছে শক্তি নয়, বরং ‘কাল’ হয়ে উঠছে?যে রাতটি সাইফের জীবনকে দুই ভাগে ভাগ করে দিল। ২০২১ সালের ১৬ জুন।চট্টগ্রামের অক্সিজেন মোড়। রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টা।হোটেল জামানের সামনে  তখন হয়তো অন্য রাতগুলোর মতোই স্বাভাবিক পরিবেশ। কিন্তু সাইফের জীবনে সেই রাতটি আর কখনো স্বাভাবিক থাকেনি।সাইফের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই রাতে তৎকালীন বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি কামরুজ্জামানসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাঁকে সাদা পোশাকে আটক করেন। তাঁর দাবি, পাঁচজন এসআই তাঁকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে একটি প্রাইভেটকারে তুলে নেন।তারপর চোখ বেঁধে দেওয়া হয়।অন্ধকারের মধ্যেই শুরু হয় গাড়ির যাত্রা।কোথায় যাচ্ছেন—জানেন না।কেন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে—জানেন না।সামনে কী অপেক্ষা করছে—সেটিও জানেন না।শুধু গাড়ির শব্দ।সাইফের বর্ণনা অনুযায়ী, গাড়িটি নগরের বিভিন্ন সড়ক ঘুরতে থাকে। সময় গড়িয়ে যায়। রাত গভীর হয়। একপর্যায়ে গাড়ি থামে লিংক রোড এলাকায়।সেখানে সড়কের দুই পাশে গার্ডার দিয়ে চলাচল বন্ধ করা হয়েছিল।এরপর তাঁকে গাড়ি থেকে নামানো হয়।চোখ তখনও বাঁধা।রাস্তার পাশে কিছুটা ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। এরপর উপুড় করে ফেলা হয়।তারপর—একটি গুলি।বাম পায়ে।প্রায় দুই মিনিট পর একই জায়গায় এসআই অসীম দাশ আরও একটি গুলি করেন।এরপর আর কিছু মনে নেই তাঁর।অন্ধকার।নিস্তব্ধতা।আর একটি পায়ের সঙ্গে তাঁর জীবনের স্বাভাবিক সম্পর্কেরও যেন সেখানেই শেষ।তিনি হারিয়েছেন একটি পা।কিন্তু হারাননি তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস।এক পা হারিয়ে হাসপাতালের বিছানা থেকে আবার রাজপথে।একটি পা হারানোর পর একজন মানুষের প্রথম চিন্তা হওয়ার কথা নিজের জীবন নিয়ে।চিকিৎসা কীভাবে হবে?সংসার চলবে কীভাবে।ভবিষ্যৎ কী?হাঁটবেন কীভাবে?অন্যদের সাহায্য ছাড়া চলতে পারবেন তো?কিন্তু সাইফের গল্পে হাসপাতালের বিছানা যেন শেষ অধ্যায় হয়নি।বরং সেখান থেকেই শুরু হয়েছে আরেক যুদ্ধ।শরীরের সঙ্গে যুদ্ধ।দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ।মামলার সঙ্গে যুদ্ধ।অপমানের সঙ্গে যুদ্ধ।
আর সবচেয়ে বড়—নিজের ভেতরের ভেঙে পড়া মানুষটির সঙ্গে যুদ্ধ।সাইফের ঘনিষ্ঠদের দাবি, এমন সময়ও গেছে যখন তাঁর হাতে টাকা ছিল না, ঘরে পর্যাপ্ত খাবার ছিল না। কিন্তু রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি।রাজনীতি তাঁর কাছে তখন আর শুধু একটি দলীয় পরিচয় ছিল না।এটি হয়ে উঠেছিল জীবনের সঙ্গে মিশে যাওয়া এক বিশ্বাস।১৭ বছর—একটি জীবনের সেরা সময়ের হিসাব।১৭ বছর রাজনীতি খুব দীর্ঘ সময়।একজন তরুণ যখন রাজনীতিতে প্রবেশ করেন, তখন তাঁর সামনে থাকে স্বপ্ন।পদ পাওয়ার স্বপ্ন।নেতৃত্ব দেওয়ার স্বপ্ন।মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন।কখনো কখনো নিজের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার স্বপ্নও।সাইফও হয়তো সেই স্বপ্ন নিয়েই রাজনীতিতে এসেছিলেন।কিন্তু সময় তাঁকে দিয়েছে অন্য হিসাব।মিছিলের পাশাপাশি মামলা।স্লোগানের পাশাপাশি গ্রেপ্তার।রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি কারাগার।আর শেষ পর্যন্ত শরীরের একটি অংশ হারানোর নির্মম বাস্তবতা।তারপরও তিনি বলেননি—‘আমি আর রাজনীতি করব না।’বরং তাঁর দাবি—যতদিন বেঁচে আছেন, জাতীয়তাবাদী আদর্শ ধারণ করেই বাঁচবেন।যখন অনেকে নিরাপদ দূরত্বে, তখন সাইফ কোথায় ছিলেন?রাজনীতির ইতিহাসে সুসময় ও দুঃসময় পাশাপাশি হাঁটে।ক্ষমতার সময় মিছিল বড় হয়।সভায় মানুষের ভিড় বাড়ে।অনেক নতুন মুখ সামনে আসে।কিন্তু দুঃসময়?তখন হিসাবটা বদলে যায়।কেউ আত্মগোপনে যান।কেউ বিদেশে চলে যান।কেউ রাজনীতি থেকে দূরে সরে যান।কেউ আবার অপেক্ষা করেন—সময় কখন বদলাবে।সাইফের অনুসারীদের দাবি, তিনি সেই সময়ে রাজপথ ছাড়েননি।মামলা তাঁকে থামাতে পারেনি।কারাগার তাঁকে থামাতে পারেনি।একটি পা হারানোও তাঁকে থামাতে পারেনি।এ কারণেই তাঁর ঘনিষ্ঠদের চোখে সাইফ শুধু একজন রাজনৈতিক কর্মী নন—তিনি দুঃসময়ের একজন ‘সাক্ষী’।যে সাক্ষীর শরীরেই রয়ে গেছে সেই সময়ের ক্ষত।৭ নম্বর ওয়ার্ড থেকে নগরজুড়ে।সাইফুল ইসলাম সাইফের রাজনৈতিক পরিচিতির অন্যতম কেন্দ্র চট্টগ্রাম নগরের ৭ নম্বর ওয়ার্ড।কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচি ও মিছিল ঘিরে আলোচনাটি আর শুধু ওই ওয়ার্ডে সীমাবদ্ধ নেই।নগরের বিভিন্ন এলাকায় তাঁর কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি, মিছিলের দৃশ্যমানতা এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ তাঁকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে বলে দাবি তাঁদের।এখানেই তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।একটি পা হারানো, পদ-পদবি না থাকা একজন রাজনৈতিক কর্মীর মিছিলে এত মানুষ কেন?এটি কি শুধু ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা?নাকি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্কের ফল?নাকি দুঃসময়ে পাশে থাকা একজন কর্মীর প্রতি তৃণমূলের স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা?সাইফের অনুসারীদের উত্তর খুব সরল—“যে মানুষটি বিপদের দিনে পাশে ছিল, মানুষও তার পাশে থাকে।”কিন্তু জনপ্রিয়তার সঙ্গে কি বাড়ছে শত্রুতাও?রাজনীতিতে জনপ্রিয়তা আশীর্বাদ।কিন্তু কখনো কখনো জনপ্রিয়তাই হয়ে উঠতে পারে অস্বস্তির কারণ।সাইফের ঘনিষ্ঠদের অভিযোগ, তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে নিয়ে দলের অভ্যন্তর থেকেই নানা ধরনের অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।কখনো ‘সন্ত্রাসী’।কখনো ‘চাঁদাবাজ’।কখনো ‘কিশোর গ্যাংয়ের লিডার’। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে যদি একজনের  ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা হয়, তাহলে সেটি নোংরামি।আওয়ামী লীগের দেওয়া তকমা শুনলে এখনো চোখে পানি আসে’কথা বলতে বলতে একসময় সাইফের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে।রাজনীতির কথা বলতে গিয়ে যিনি দৃঢ় থাকেন, তাঁর কণ্ঠেও কিছু প্রশ্নের সামনে এসে যেন অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে।তিনি বলেন—“আওয়ামী লীগের দেওয়া তকমা যখন এখনো শুনি, চোখ থেকে নীরবে অশ্রু আসে। জীবন যতদিন থাকবে, ততদিন জাতীয়তাবাদী আদর্শ বুকে ধারণ করে জীবন দিয়ে যাব।”একজন রাজনীতিকের কাছে ‘সন্ত্রাসী’ তকমা শুধু একটি শব্দ নয়।এটি সামাজিক পরিচয়ের ওপর আঘাত।পরিবারের ওপর চাপ।সন্তানদের সামনে প্রশ্ন।বন্ধুদের মধ্যে দূরত্ব।আর নিজের ভেতরে প্রতিনিয়ত একটা প্রশ্ন—“আমি কি সত্যিই এমন?”সাইফের দাবি, সেই তকমা আজও তাঁকে বহন করতে হচ্ছে।দলের সুসময় এসেছে, কিন্তু সাইফের জীবনে কী এসেছে?এখানেই গল্পটি সবচেয়ে বেশি বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে।একজন কর্মী যখন দুঃসময়ে নিজের সবকিছু দিয়ে দলের পাশে থাকেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাঁর প্রত্যাশা থাকে—সুসময় এলে দলও তাঁকে মনে রাখবে।কেউ পদ পাবেন।কেউ দায়িত্ব পাবেন।কেউ সাংগঠনিক স্বীকৃতি পাবেন।কেউ হয়তো অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা নিরাপদ হবেন।সাইফের অনুসারীদের প্রশ্ন—তাঁর ক্ষেত্রে কী হয়েছে?একটি পা হারিয়েছেন।রাজনৈতিক জীবনের বড় একটি অংশ মামলা ও জেল-জুলুমে কেটেছে।শারীরিকভাবে স্থায়ী ক্ষতির শিকার হয়েছেন।তারপরও রাজনীতি ছাড়েননি।তবুও কেন তাঁর সামনে এখনো অনিশ্চয়তা?কেন তাঁকে নিজের ত্যাগের মূল্যায়নের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে?‘যেদিন মারা যাব, সেদিন হয়তো দল আমাকে মনে করবে’এই একটি বাক্যেই যেন সাইফের ১৭ বছরের রাজনৈতিক জীবনের সব অভিমান এসে জমা হয়।তিনি বলেন—“যেদিন মারা যাব, হয়তো তখন দল আমার জন্য আফসোস করবে। মিডিয়ায় লাল অক্ষরে শিরোনাম হবে—দলের জন্য প্রাণ দিলেন সাইফুল। আমার পরিবার হয়তো আর্থিক অনুদানও পেতে পারে, পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণাও আসতে পারে। কিন্তু কিছুদিন পর সবাই ভুলে যাবে।”কথাগুলো বলার সময় তাঁর চোখের সামনে হয়তো ভেসে ওঠে নিজের অতীত।গুলির রাত।হাসপাতালের বিছানা।হারানো পা।মামলার দিনগুলো।কারাগারের রাত।রাজনৈতিক কর্মসূচি।মিছিল।স্লোগান।আর আজকের দিন।কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় ভয় মৃত্যু নয়।ভয় হলো—বেঁচে থাকতে তাঁর ত্যাগ কেউ দেখবে না।স্বীকৃতি মৃত্যুর পরে নয়, জীবিত অবস্থায় চান।সাইফের কথার ভেতরে তাই একটি গভীর আকাঙ্ক্ষা আছে।তিনি হয়তো কোটি টাকা চান না।হয়তো বড় কোনো পদও তাঁর একমাত্র লক্ষ্য নয়।তিনি চান—তাঁর দীর্ঘ পথচলাকে স্বীকার করা হোক।তিনি চান—তাঁকে তাঁর অতীত দিয়ে বিচার করা হোক।কিন্তু রাজনৈতিক অপবাদ দিয়ে যেন তাঁর জীবনকে দ্বিতীয়বার পঙ্গু করা না হয়।কারণ তাঁর শরীর ইতোমধ্যে একটি পা হারিয়েছে।তিনি আর হারাতে চান না তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়।একটি পা হারানো মানুষটির সবচেয়ে বড় শক্তি—মানুষ।সাইফের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে কথা বললে একটি বিষয় বারবার সামনে আসে—তাঁর রাজনৈতিক শক্তি শুধু পদ বা সংগঠন নয়।তাঁর শক্তি তাঁর সঙ্গে থাকা মানুষগুলো।যারা তাঁর সঙ্গে মিছিল করে।যারা তাঁকে ঘিরে দাঁড়ায়।যারা তাঁর বক্তব্য শোনে।যারা তাঁকে এখনো ‘সাইফ ভাই’ বলে ডাকে।রাজনীতিতে এই সম্পর্ক তৈরি করা সহজ নয়।পদ দিয়ে মানুষকে কিছুদিন পাশে রাখা যায়।ক্ষমতা দিয়ে ভিড় তৈরি করা যায়।কিন্তু দীর্ঘদিনের সম্পর্ক তৈরি হয় অন্যভাবে।দুঃসময়ে।বিপদের দিনে।যখন একজন কর্মীর পাশে দাঁড়ানোর মতো আর কেউ থাকে না।সাইফের অনুসারীদের দাবি, সেই জায়গাটিই তিনি তৈরি করেছেন।তাহলে সাইফের জনপ্রিয়তা কারও ‘কাল’?প্রশ্নটি হয়তো কঠিন।কিন্তু রাজনীতিতে কঠিন প্রশ্নই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।একজন ত্যাগী কর্মী জনপ্রিয় হলে দলের শক্তি বাড়ার কথা।একজন কর্মী মানুষের ভালোবাসা পেলে সেটি সংগঠনের সম্পদ হওয়ার কথা।একজন পঙ্গু কর্মী নিজের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে রাজপথে দাঁড়ালে সেটি নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হওয়ার কথা।তাহলে সেই জনপ্রিয়তা কেন কারও অস্বস্তির কারণ হবে। যদি তাঁর বিরুদ্ধে কেবল রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থেকেই অভিযোগ তৈরি হয়, তাহলে সেই অভিযোগ শুধু একজন সাইফকে নয়, ক্ষতিগ্রস্ত করবে পুরো রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেই।এটি শুধু একজন সাবেক ছাত্রদল নেতার গল্প নয়।এটি সেই হাজারো কর্মীর গল্প, যারা দুঃসময়ে দলের পতাকা ধরে রাখেন।এটি সেইসব কর্মীর গল্প, যারা রাতের অন্ধকারে মিছিল করেন।মামলার তারিখে আদালতে যান।গ্রেপ্তারের ভয় নিয়েও কর্মসূচিতে থাকেন।নেতৃত্বের জন্য নয়—বিশ্বাসের কারণে রাজনীতি করেন।কিন্তু সময় বদলে গেলে তাদের অনেকেই হারিয়ে যান।কারও নাম থাকে না পোস্টারে।কারও নাম থাকে না মঞ্চে।কারও ত্যাগের হিসাব থাকে না দলীয় নথিতে।কেউ কেউ আবার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করেন—“কবে আমাকে মনে করবে আমার দল?”শেষ প্রশ্নটি তাই সাইফের জন্য নয়,রাজনীতির জন্য সাইফুল ইসলাম সাইফ আজও রাজপথে।একটি পা নেই।কিন্তু হাতে এখনো রাজনৈতিক পতাকা।শরীরে ক্ষত আছে।কিন্তু কণ্ঠে এখনো স্লোগান।মনে অভিমান আছে।কিন্তু আদর্শ থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা নেই।১৭ বছর ধরে তিনি যে পথ পেরিয়েছেন, সেই পথের প্রতিটি বাঁকে রয়েছে গল্প।কোথাও গুলি।কোথাও কারাগার।কোথাও ক্ষুধা।কোথাও অপমান।কোথাও বন্ধুর হাত।কোথাও মানুষের ভালোবাসা।আর আজ—দলের সুসময়ে দাঁড়িয়ে তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি যেন একটাই—“আমি কি এতদিন শুধু মৃত্যুর পর স্মরণীয় হওয়ার জন্যই লড়েছি?”হয়তো সাইফ কোনো পুরস্কার চান না।হয়তো চান না বিশাল কোনো আয়োজন।হয়তো শুধু চান—দলের কেউ একদিন তাঁর দিকে তাকিয়ে বলুক,“তোমার ত্যাগ আমরা ভুলিনি।”কারণ একটি পা হারানোর কষ্ট হয়তো চিকিৎসা দিয়ে সামলানো যায়।মামলার কষ্ট হয়তো সময়ের সঙ্গে কমে যায়।জেল-জুলুমের স্মৃতিও একদিন পুরোনো হয়।কিন্তু একজন মানুষের সবচেয়ে গভীর ক্ষত হয় তখন—যখন সে অনুভব করে, তার ত্যাগের কথা কেউ মনে রাখেনি।সাইফের লড়াই তাই এখন শুধু রাজপথে টিকে থাকার লড়াই নয়।এটি স্বীকৃতির লড়াই।এটি নিজের পরিচয় ফিরে পাওয়ার লড়াই।এটি প্রমাণ করার লড়াই—একটি পা হারালেও একজন মানুষ তার স্বপ্ন হারায় না।আর শেষ পর্যন্ত সময়ই হয়তো উত্তর দেবে—সাইফুল ইসলাম সাইফের ১৭ বছরের ত্যাগ কি জীবদ্দশায় মূল্যায়িত হবে, নাকি তাঁর আশঙ্কার মতো মৃত্যুর পরই কেবল লেখা হবে—‘দলের জন্য জীবন দিয়ে গেলেন সাইফুল’?

বিষয়:

এলাকার খবর

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL