হিমছড়ি ডালায় ছাত্রদল নেতাকে কুপিয়ে গুরুতর জখম, মধ্যম শিয়াপাড়ায় ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অস্ত্রের মুখে দেড় লাখ টাকা লুট; দুই ডাকাত গ্রেপ্তার, দুই মূলহোতা পলাতক।
কক্সবাজারের ঈদগাঁও-ঈদগড় সড়কে দীর্ঘদিনের ডাকাতি ও অপহরণের আতঙ্ক এখনো কাটেনি। স্থানীয়দের দাবি, নানা প্রতিশ্রুতি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পরও সড়কটিতে সংঘবদ্ধ ডাকাতচক্রের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
ঈদগাঁও উপজেলার ইসলামাবাদ ইউনিয়নের পূর্ব গজালিয়া ও ভোমরিয়াঘোনা, রামু উপজেলার ঈদগড় ইউনিয়ন এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নসহ তিন উপজেলার প্রায় দুই লক্ষাধিক মানুষের নিত্যদিনের যাতায়াতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এটি। কিন্তু সন্ধ্যা নামলেই সড়কটি যেন আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাত প্রায় ১১টার দিকে ঈদগাঁও-ঈদগড় সড়কের হিমছড়ি ডালা এলাকায় সংঘবদ্ধ ডাকাতদল সড়কে গাছ ফেলে একটি মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে হামলা চালায়।
এ সময় ঈদগড় ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সিকদারপাড়া এলাকার আকবর হোসেনের ছেলে নাজির শাহকে ধারালো চাইনিজ দা দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। স্বজনদের দাবি, তিনি আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
একই মোটরসাইকেলে থাকা ৭ নম্বর ওয়ার্ডের টুটার বিল এলাকার বাসিন্দা ও ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোক্তা বদি আলমের ছেলে মোর্শেদের ওপরও হামলা চালায় ডাকাতরা। তাকে মারধর করে জঙ্গলের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হলে তিনি কৌশলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তবে ডাকাতরা তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ ও পাসপোর্ট ছিনিয়ে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে ডাকাতদল ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে ঈদগাঁও থানা পুলিশ এবং ঈদগড় পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয়দের সহায়তায় আশপাশের এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে।
ঘটনাস্থলে ছুটে যাওয়া ইসলামাবাদ ইউনিয়নের গজালিয়া ৯ নম্বর ওয়ার্ডের জনপ্রতিনিধি জুবায়েদ উল্লাহ জুয়েল বলেন, "রাতে হঠাৎ চিৎকার শুনে আমরা ঘটনাস্থলে ছুটে যাই। তখন দেখি ডাকাতদের হাত থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে ভুক্তভোগী মোর্শেদ খাল পার হয়ে এপারে চলে এসেছে। খবর পেয়ে পুলিশও দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে। পরে পুলিশ, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়দের নিয়ে আশপাশের এলাকায় অভিযান চালানো হলেও কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।"
একই রাতে ঈদগাঁও সদর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যম শিয়াপাড়া এলাকায় আরও একটি ডাকাতির ঘটনা ঘটে। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রাত আনুমানিক ১২টা ২০ মিনিটের দিকে মধ্যম শিয়াপাড়ার বাসিন্দা ব্যবসায়ী রহিম উদ্দিন (২৮) নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে বসতবাড়ির সামনে পৌঁছালে ফারুক মিয়া, মো. সাজ্জাদ ওরফে আব্বুইয়াসহ কয়েকজন তার গতিরোধ করে মারধর করে। পরে অস্ত্রের মুখে তার কাছে থাকা নগদ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনার সংবাদ পেয়ে ঈদগাঁও থানা পুলিশের একটি দল তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে এজাহারভুক্ত দুই আসামি ফারুক মিয়া (৪২) ও মো. সাজ্জাদ ওরফে আব্বুইয়া (২৭)-কে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় ডাকাত দলের দুই মূলহোতা সালেক ও জয়নাল এখনও পলাতক রয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে সম্ভাব্য সব স্থানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে ছিনতাই হওয়া নগদ অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
এ বিষয়ে ঈদগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এটিএম শিফাতুল মাজদার বলেন, ঈদগাঁও-ঈদগড় সড়কে পুলিশের নিয়মিত টহল রয়েছে। তবে সড়কের কিছু নির্জন ও পাহাড়ি অংশে পুলিশের উপস্থিতি না থাকার সুযোগে সংঘবদ্ধ অপরাধীরা এসব ঘটনা ঘটিয়ে থাকে। অপরাধ দমন এবং এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ সর্বদা তৎপর।
তিনি আরও বলেন, একই রাতে মধ্যম শিয়াপাড়া এলাকায় টাকা লুটের ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আদালতে সোপর্দ করা হচ্ছে। পাশাপাশি পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সড়কে ডাকাতির বিষয়ে ঈদগড় পুলিশ ফাঁড়ির এসআই খুরশিদ আলম বলেন, ঈদগাঁও-ঈদগড় সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা নিয়মিত টহল ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছি। ডাকাতির খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে গুরুতর আহত নাজির শাহকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠিয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
উল্লেখ্য,জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এক জনসভায় সাংবাদিক আজিজুর রহমান রাজুর এক প্রশ্নের জবাবে কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল বলেছিলেন, তিনি নির্বাচিত হলে ঈদগাঁও-ঈদগড় সড়কে ডাকাতি ও অপহরণ বন্ধ হবে। তবে একই রাতে সংঘটিত এসব ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আহমেদ রফিক বলেন, ঈদগাঁও-ঈদগড় সড়কে ডাকাতি ও অপহরণ দীর্ঘদিনের সমস্যা। এটি প্রতিরোধে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ আমরা দেখতে পাচ্ছি না। সন্ধ্যার পর এই সড়কে চলাচল করা যেন মৃত্যুফাঁদে পা রাখা। মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
স্থানীয়রা বলছেন, গত এক দশকে ঈদগাঁও-ঈদগড় সড়কে অন্তত পাঁচ শতাধিক ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় সাধারণ পথচারীর পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও আক্রান্ত হয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে বলে তাদের দাবি।
বছরের পর বছর ধরে ঈদগাঁও-ঈদগড় সড়কে ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণের অভিযোগ থাকলেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের দাবি, নিয়মিত পুলিশ টহল জোরদার, বিশেষ অভিযান, সড়কের দুই পাশে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং স্থায়ী পুলিশ চেকপোস্ট চালু করা হলে এ ধরনের অপরাধ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।