পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম চাষ বা স্থানান্তর কৃষির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে অনেক পাহাড়ি পরিবার এখন হস্তশিল্প ও কারুপণ্যের মাধ্যমে নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন করছেন। এটি একদিকে যেমন স্বাবলম্বী করে তুলছে, অন্যদিকে বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে টিকিয়ে রাখছে।
দুর্গম পাহাড়ি জনপদে আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠছে বাঁশের তৈরি হস্ত ও কারুপণ্য। পরিবেশবান্ধব ও শৌখিন হওয়ায় এসব পণ্যের চাহিদাও দিনদিন বাড়ছে। বাঁশের তৈরি নান্দনিক পণ্যের শৈল্পিক নির্মাণাদি ঐতিহ্যের বহিঃপ্রকাশ। সময় ও যুগের পালাবদলে নিত্যনতুন প্রযুক্তি এলেও এখনো মানুষের পছন্দের তালিকা থেকে বাদ পড়েনি বাঁশের তৈরি হস্ত ও কারুপণ্য। কখনো প্রয়োজন, কখনো শৈল্পিক সামগ্রী, দুই-ই মেটাতে সক্ষম বাঁশজাত পণ্য।
বাঁশের বহুমুখী ব্যবহারে জুম ঘর, পানির বোতল, জগ, কেটলি, মগ, বাঁশের ট্রেসহ বিভিন্ন ধরনের নান্দনিক পণ্য তৈরি করছেন রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের ১০ নম্বর পাড়ার বাসিন্দা রনজিৎ চাকমা (৩২)। রনজিৎ নিপুণ হাতে বাঁশের তৈরি এসব নান্দনিক আসবাবপত্রে স্বপ্ন বুনছেন।
শৌখিন ব্যক্তিদের কাছে রনজিৎ-র এসব হস্তশিল্পের বেশ কদর রয়েছে। স্থানীয় গ্রাম থেকে শুরু করে শহর, হোটেল, রিসোর্টেও রয়েছে এর ব্যাপক চাহিদা। তা ছাড়া বাজারে অনেকটাই দুষ্প্রাপ্য এসব পণ্য বিক্রি হয় চড়া দামে।
সম্প্রতি দীঘিনালার বোয়ালখালি বাজারের সাপ্তাহিক হাটে বাঁশের তৈরি হস্ত ও কারুপণ্য বিক্রি করতে আসলে রনজিৎ'র সাথে কথা বলে জানা যায়, একসময় সাজেকের দুর্গম পাহাড়ে জুম চাষে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। কিন্তু সময়ের পালাবদলে জুম চাষ থেকে আয়কৃত অর্থ দিয়ে পরিবারের ভরণ পোষণ সম্ভব হতো না। তাই বিকল্প কিছু করার চিন্তা থেকে ২০১৯ সালে বাঁশের তৈরি হস্তশিল্পে মনোনিবেশ করেন। স্থানীয় বাজার ও পর্যটকদের কাছে তার তৈরি পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এখন তিনি বাঁশের তৈরি নান্দনিক পণ্য বানিয়ে নিজেকে একজন স্বাবলম্বী উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলেছেন।
বাঁশের তৈরি এসব নান্দনিক পণ্য তৈরিতে তিনি কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করেন পাকা বিমিটিংগা বাঁশ, উড়া বাঁশ, বড়াক বাঁশ ও নুলি বাঁশ। তিনি অর্থের বিনিময়ে এসব বাঁশ পাহাড় থেকে সংগ্রহ করেন। পরে দা, গ্যাস, পাওয়ার বন, ঘাম ও এক ধরনের বিশেষ বার্নিশ ব্যবহার করে মেশিন ছাড়াই নিজের নিপুণ হাতে বিভিন্ন রকমের ফুল, প্রজাপতি ও পাতার ছবি একে নিজের স্বপ্নকে বাঁশের তৈরি এসব পণ্যে বাস্তবে রুপ দেন।
তার তৈরি পণ্যের দাম সাধারণত ১০০ টাকা থেকে শুরু করে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। একটি পণ্য তৈরি করতে সময় লাগে ২০ মিনিট থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ দেড় দিন পর্যন্ত। প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৩৫টি ছোট পণ্য তৈরি করতে পারেন। প্রতি সপ্তাহে তিনি প্রায় ২০টি বোতল, ১০০টি মগ, ৫-৬টি ট্রে এবং একটি জুম ঘর তৈরি করেন।
তার আয় সম্পর্কে তিনি জানান, তিনি প্রতি বাজারে ৪-৫ হাজার টাকার বাঁশের এসব হস্ত ও কারুপণ্য বিক্রি করেন। প্রতি মাসে সব খরচ বাদ দিয়ে তিনি প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা আয় করে থাকেন। মাঝে মধ্যে বিক্রি বেশি হলে ৩০-৩৫ হাজার টাকাও আয় করতে পারেন। যা দিয়ে পরিবার নিয়ে সুখে শান্তিতে বাস করতে পারছেন তিনি। সরকারের সহযোগিতা পেলে আরও বড় পরিসরে এসব হস্ত ও কারুপণ্য তৈরি করে আদি ঐতিহ্য রক্ষা ও পাহাড়ের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে আশা করেন তিনি।
দীঘিনালা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বদিউজ্জামাল জীবন বলেন, বাঁশের তৈরি হস্ত ও কারুপণ্য আমাদের সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। রনজিৎ চাকমা তার প্রচেষ্টার মাধ্যমে এসব পণ্য তৈরি করে পাহাড়ের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে তা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।
বাঘাইছড়ির স্থানীয় সাংবাদিক মো. মহিউদ্দিন বলেন, শহর ও পর্যটকদের কাছে বাঁশের তৈরি হস্ত ও কারুপণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সরকারের সহযোগিতা ও প্রশিক্ষণ পেলে রনজিৎ চাকমা এসব পণ্য তৈরির আধুনিক উপকরণের মাধ্যমে আরও বেশি দক্ষ হয়ে উঠবে। তার দেখাদেখি অন্যান্যরাও এসব পণ্য তৈরিতে আগ্রহী হয়ে উঠবে এবং পাহাড়ের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছি।
স্থানীয়রা জানান, রনজিৎ চাকমার তৈরি বাঁশের পণ্যগুলো শুধু স্থানীয় বাজারেই নয়, পর্যটকদের কাছেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তার এই উদ্যোগ পাহাড়ি এলাকায় বিকল্প আয়ের একটি সম্ভাবনাময় দৃষ্টান্ত তৈরি হতে পারে।
খাগড়াছড়ির বিসিক'র উপ ব্যবস্থাপক ও শিল্পনগরী কর্মকর্তা মো. আলী আল রাজী বলেন, যদিও তিনি খাগড়াছড়ি জেলার বাহিরে তবুও বিভিন্ন মাধ্যমে শুনেছি রনজিউ চাকমা নিজ উদ্যোগে পাহাড় থেকে বাঁশ সংগ্রহ করে হস্তশিল্পের কাজ করেন। একজন বাঁশের পণ্য উৎপাদনকারী হিসেবে তাকে সহযোগিতার জন্য সচেষ্ট আছি। বিসিক শিল্পের একজন স্থানীয় শিল্পী হিসেবে তাকে নিবন্ধন সুবিধা সহ ক্ষুদ্র ঋণের সুযোগ সুবিধা প্রদান এবং এই শিল্পটি বড় আকারে করলে আমরা ব্যাংক ঋণের জন্য রাঙামাটি বিসিকে সুপারিশ করবো।
এই রূপান্তর পাহাড়ের অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনছে এবং পার্বত্যাঞ্চলে বসবাসকারীদের সামাজিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে বলে মনে করছেন হস্তশিল্প সংশ্লিষ্টরা।