সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলমকে ঘিরে আবারও রাজনৈতিক অঙ্গনে তুমুল আলোচনা শুরু হয়েছে। পহেলা বৈশাখে তাঁর বাসায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর নেতা ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর আগমনের পর থেকেই বিষয়টি “টক অব দ্য টাউন” থেকে “টক অব দ্য কান্ট্রি”-তে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম নগরের রাজনৈতিক অঙ্গনে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে।
অনেকেই তাঁকে ‘পল্টিবাজ’ বলে আখ্যায়িত করছেন। এমনকি তাঁর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান মোস্তফা হাকিম গ্রুপের কার্যালয় বুধবার (১৫ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে তিনটা থেকে রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ অবরুদ্ধ করে রাখেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের অবস্থান পরিবর্তন নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। কেউ এস আলম গ্রুপের বন্দোবস্ত করছেন আবার কেউ মোস্তফা হাকিম গ্রুপের বন্দোবস্ত করছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন।
রাজনীতিতে কি অর্থের প্রভাবই এখন প্রধান নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে?
অবরোধে অংশ নেওয়া কয়েকজন বলেন, মনজুর আলম সুযোগসন্ধানী এবং দলবদলে অভ্যস্ত। তাঁদের অভিযোগ, তিনি আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপি, আবার বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগ—এভাবে বারবার দল পরিবর্তন করেছেন এবং বর্তমানে এনসিপিতে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তাঁদের ভাষায়, তিনি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী নন; বরং সুবিধা অনুযায়ী অবস্থান পরিবর্তন করেন।
সাবেক ছাত্রদল নেতা জিসান বলেন, “মনজুর আলমের রাজনৈতিক চরিত্র হচ্ছে পল্টিবাজের চরিত্র।” অন্যদিকে ব্যবসায়ী কফিলের মতে, “রাজনীতির গতি পরিবর্তন করা তাঁর স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য।”
উল্লেখ্য, চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর হাত ধরে রাজনীতিতে উত্থান ঘটে মোহাম্মদ মনজুর আলমের। ২০১০ সালে তিনি রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করে বিএনপির সমর্থনে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন।
বর্তমানে আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে নতুন করে সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। বিএনপির সম্ভাব্য একক প্রার্থী হিসেবে বর্তমান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের নাম আলোচনায় থাকায় মনজুর আলমের সেই দল থেকে মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে জামায়াত থেকেও শক্ত কোনো প্রার্থী এখনো দৃশ্যমান নয়।
এ অবস্থায়, আসন্ন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার লক্ষ্যে মনজুর আলম এনসিপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছেন বলে রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে।
এর আগে, আওয়ামী লীগ থেকে বের হয়ে বিএনপিতে যোগ দেওয়া এবং পরে ২০১৫ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আবার আওয়ামী লীগে ফিরে আসেন তিনি। সে সময় এক অনুষ্ঠানে তিনি দাবি করেছিলেন, তাঁর পরিবার আওয়ামী লীগের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সম্পৃক্ত এবং তিনি নিজেও তৃণমূল পর্যায়ের কর্মী।
২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের একটি আসনে আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) মনোনয়ন চেয়ে ব্যর্থ হন মনজুর আলম। ওই বছর তিনি আর নির্বাচন করেননি। ২০২০ সালে সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম কেনেন মনজুর আলম। তবে সেবারও তাঁকে মনোনয়ন দেয়নি আওয়ামী লীগ।
বিএনপির রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার পর দুই দফায় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইলেও দলটির কোনো পদে ছিলেন না মনজুর আলম।
বর্তমানে সেই মনজুর আলমকে ঘিরে আবারও দলবদলের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা ও কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে।
এ বিষয়ে এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগরের সমন্বয়কারী সদস্য ও মিডিয়া সেলের প্রধান সমন্বয়কারী রিদুয়ান হৃদয় সাংবাদিকদের বলেন, হাসনাত আবদুল্লাহ মূলত ব্যক্তিগত কাজে চট্টগ্রামে এসেছিলেন। এ সময় সাবেক মেয়র মনজুর আলমের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে তিনি তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
সাবেক মেয়র মনজুর আলম বলেন, ‘সংসদ সদস্য এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ চট্টগ্রামে এসেছিলেন। পরে উনি আমার বাসায় বেড়াতে আসেন। বাসায় তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়েছে। এর বেশি কিছু নয়।আমি আওয়ামীলীগের দোসর কোত্থেকে হলাম। আমি বিএনপি'র মেয়র ছিলাম। আমার বিরুদ্ধে কোন মামলা নেই।তবে এই মনজুর আলম একসময় প্রথম সারির গণমাধ্যমকে বক্তব্য দিয়েছিলেন,আওয়ামী লীগের জন্মলগ্ন থেকেই দলটির সঙ্গে আমার বাপ–দাদা সম্পৃক্ত ছিলেন। আমিও আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের কর্মী। তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীকে আওয়ামী লীগের কোন জায়গায় যোগ দিতে হয়? আমার ভাতিজাও এখন আওয়ামী লীগের এমপি।