টানা পাঁচ দিনের অবিরাম বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বৃহত্তর চট্টগ্রাম। ভয়াবহ এ দুর্যোগে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ জনে। সর্বশেষ শুক্রবার (১০ জুলাই) সকালে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় পাহাড়ি ঢলের স্রোতে ভেসে গিয়ে মিরাজ (৫) ও আশিক (৬) নামে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এতে চট্টগ্রাম জেলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে পাঁচে পৌঁছেছে। অন্যদিকে সরকারি হিসাবে বৃহত্তর দুর্যোগে মোট প্রাণহানির সংখ্যা ৩০ জন হলেও সর্বশেষ দুই শিশুসহ বিভিন্ন সূত্রে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৩ জন হয়েছে।
জানা গেছে, শুক্রবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নের পৃথক এলাকায় নিজ নিজ বাড়ির উঠানে খেলতে বের হলে পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্রোতে ভেসে যায় দুই শিশু। স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলেও পথেই তাদের মৃত্যু হয়।
নিহত আশিক বাহারছড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ ইলশা গ্রামের মেহের আলী বাড়ির প্রবাসী কামাল উদ্দিনের ছেলে। অপর শিশু মিরাজ একই ইউনিয়নের রত্নপুর এলাকার বাসিন্দা।
বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল হক দুই শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, পাহাড়ি ঢলের পানির স্রোতে ভেসে গিয়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অভিভাবকদের শিশুদের নিরাপদ স্থানে রাখার আহ্বান জানান তিনি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলমান দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে কক্সবাজারে। সরকারি হিসাবে কক্সবাজারে ১৯ জন, চট্টগ্রামে ৫ জন, বান্দরবানে ৫ জন এবং রাঙামাটিতে ১ জনসহ মোট ৩০ জনের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। তবে সর্বশেষ দুই শিশুসহ বিভিন্ন স্থানের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী প্রাণহানির সংখ্যা আরও বেড়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু অত্যন্ত সক্রিয় থাকায় গত পাঁচ দিনে চট্টগ্রামে রেকর্ড ১ হাজার ২০ দশমিক ৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। ফলে চট্টগ্রাম নগরীসহ সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালীর বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সাতকানিয়ায় প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলায় অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।
পাহাড়ি ঢলে সাঙ্গু, ডলু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তলিয়ে গেছে অসংখ্য সড়ক, বিচ্ছিন্ন হয়েছে বিভিন্ন এলাকার যোগাযোগ। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল যোগাযোগও ব্যাহত হয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুর্গত এলাকায় ১ হাজার ৫৭টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ১ হাজার ১৫০ টন চাল, শিশুখাদ্যসহ বিভিন্ন ত্রাণসামগ্রী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনী, প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
এদিকে আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকলে বন্যা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। প্রশাসনও অতি প্রয়োজন ছাড়া পাহাড়ি ঢলপ্রবণ ও প্লাবিত এলাকায় চলাচল না করতে এবং শিশুদের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
উল্লেখ্য চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলে প্রকৃতি যেন এক নির্মম পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে মানুষকে। কয়েক দিনের টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং সাঙ্গু-ডলু নদীর ভয়াল রূপে সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর বিস্তীর্ণ জনপদ পরিণত হয়েছে বিশাল জলরাশিতে। যেখানে একসময় ছিল সবুজ ধানের ক্ষেত, ব্যস্ত বাজার আর মানুষের কোলাহল—সেখানে এখন শুধু অথৈ পানি, ভাঙা ঘর, কান্না আর বেঁচে থাকার আকুতি।
লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি। অসংখ্য পরিবার হারিয়েছে বসতভিটা। কেউ ছাদে, কেউ বাঁধে, কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে, আবার কেউ নৌকার অপেক্ষায় দিনের পর দিন কাটাচ্ছেন। বিশুদ্ধ পানি, খাবার ও ওষুধের সংকট ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। শিশু, বৃদ্ধ ও গর্ভবতী নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
সাতকানিয়ার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সাঙ্গু ও ডলু নদী এবার যেন ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, উপজেলার প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। পৌরসভা, রামপুর, চরতী, বাজালিয়া, এওচিয়াসহ অধিকাংশ এলাকা এখন কার্যত বিচ্ছিন্ন দ্বীপ।
ডলু নদীর বাঁধ ভেঙে প্রবল স্রোত লোকালয়ে ঢুকে মুহূর্তেই ঘরবাড়ি তছনছ করে দেয়। অনেক পরিবার চোখের সামনে নিজেদের বসতঘর ভেঙে যেতে দেখেছে, কিন্তু কিছুই করার ছিল না।
সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় উপজেলা সদর থেকেও বহু এলাকায় পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যুৎ নেই, মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই, খাবার নেই—একটি আধুনিক জনপদ যেন কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
বন্যা শুধু সম্পদ কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে মানুষের জীবনও।চরতী এলাকায় প্রবল স্রোতে ভেসে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে কিশোর আবদুল আলম। উদ্ধার হওয়ার পর তার মরদেহ ঘিরে পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।
স্থানীয়রা বলছেন, "এবারের স্রোত আমরা আগে কখনো দেখিনি।"এই মৃত্যু এখন পুরো সাতকানিয়ার অসহায়ত্বের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাঁশখালীর চিত্র আরও হৃদয়বিদারক।
উপজেলার প্রায় ৯০ শতাংশ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত। বৈলছড়ি, চেচুরিয়া, সাধনপুর, গণ্ডামারা, সরলসহ বহু এলাকা পানির নিচে।প্রধান সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন।
অনেক ঘরের ভেতরে কোমর থেকে বুকসমান পানি। রান্নাঘর, শোবার ঘর, উঠান—সবকিছুই একাকার হয়ে গেছে।
জানাগেছে একজন গর্ভবতী নারীসহ ১৩ জনকে উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা।
সাতকানিয়ায় ৮৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।
বাঁশখালীতে চালু রয়েছে ১১০টিরও বেশি আশ্রয়কেন্দ্র।কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।অনেক মানুষই সেখানে পৌঁছাতে পারছেন না।কারও নৌকা নেই।
কারও বাড়ির সামনে ভয়ংকর স্রোত।অনেকে গবাদিপশু রেখে যেতে চাইছেন না।আবার অনেক বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষ চলাচলেই অক্ষম।ফলে হাজারো মানুষ এখনো নিজেদের বাড়ির ছাদ কিংবা উঁচু জায়গায় আটকা পড়ে আছেন।বন্যার কয়েক দিন পর সবচেয়ে ভয়াবহ সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশুদ্ধ পানির অভাব।টিউবওয়েল ডুবে গেছে।
পুকুরের পানি দূষিত।খাবার সংরক্ষণের সুযোগ নেই।অনেক পরিবার শুকনো মুড়ি আর বিস্কুট খেয়ে দিন পার করছে।শিশুদের জন্য দুধের সংকট ভয়াবহ।ডায়েরিয়া, জ্বর, চর্মরোগ ও পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।সরকারি সংস্থা, ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবীরা কাজ করছেন।প্রবল স্রোতে উদ্ধার ঝুঁকিপূর্ণ।অনেক এলাকা এখনো দুর্গম।যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।ফলে ত্রাণ পৌঁছাতে বিলম্ব হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অতিবৃষ্টি নয়, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনাও এই দুর্যোগকে ভয়াবহ করেছে।
সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—সাঙ্গু ও ডলু নদীতে পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়া।নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা।অপরিকল্পিত বসতি ও স্থাপনা।দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ।নিয়মিত ড্রেজিংয়ের অভাব।জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত।এই বন্যা কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়।এটি এখন মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে।একদিকে মানুষ হারিয়েছে ঘর।অন্যদিকে হারিয়েছে ফসল।ভেসে গেছে মাছের ঘের।মারা গেছে গবাদিপশু।বন্ধ হয়ে গেছে দোকানপাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় ব্যবসা।
দিনমজুর, কৃষক, জেলে ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে জরুরি ভিত্তিতে প
দুর্গম এলাকায় দ্রুত নৌপথে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া।
বিশুদ্ধ পানি ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট সরবরাহ।শিশু খাদ্য ও শুকনো খাবার বিতরণ।
চিকিৎসা টিম ও ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল ক্যাম্প।
পর্যাপ্ত উদ্ধার নৌকা ও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা।
নদী ও খালের দীর্ঘমেয়াদি খনন এবং টেকসই বাঁধ নির্মাণ।সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর মানুষ এখন শুধু বন্যার পানির সঙ্গে লড়ছেন না—লড়ছেন ক্ষুধা, অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যতের ভয় নিয়েও। কারও চোখে হারানো সন্তানের শোক, কারও চোখে ভেসে যাওয়া ঘরের স্মৃতি, আবার কারও চোখে একমুঠো শুকনো খাবারের অপেক্ষা।পানি একদিন নেমে যাবে। কিন্তু এই বন্যা যে ক্ষত মানুষের জীবনে রেখে যাবে, তা হয়তো অনেক বছরেও শুকাবে না। দক্ষিণ চট্টগ্রামের এই বিপর্যয় শুধু একটি জেলার নয়—এটি পুরো দেশের জন্য দুর্যোগ-প্রস্তুতি, নদী ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু অভিযোজনের কঠিন বাস্তবতার এক জাগ্রত সতর্কবার্তা।